চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) আসনে নির্বাচনী সমঝোতা ভেঙে পড়ায় ভোটের মাঠে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ১১ দলীয় জোটের সমঝোতায় আসনটি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পাওয়ার কথা থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ডা. আবু নাছের শেষ মুহূর্তে আবার সক্রিয় প্রচারণায় নামায় জোট রাজনীতিতে সৃষ্টি হয়েছে টানাপোড়েন।
এ অবস্থায় এনসিপি ও জামায়াতের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির নেতারা অভিযোগ করেন, চট্টগ্রাম-৮ আসন জামায়াতে ইসলামি ছাড়তে রাজি না হওয়ায় জোট সমঝোতা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এর প্রতিবাদ হিসেবে তারা ঘোষণা দেন, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে জামায়াতের প্রার্থীকে সমর্থন করবেন না।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এনসিপির এমন আচরণ মূলত জামায়াতের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। নিজেদের মধ্যে এই কোন্দলের কারণে প্রতিপক্ষ অর্থাৎ বিএনপির প্রার্থী বড় ধরনের সুযোগ পেয়ে যেতে পারেন ভোটের মাঠে। যদিও জাতীয় নাগরিক পার্টির সংগঠিত জনভিত্তি তুলনামূলকভাবে দুর্বল, তবে জুলাই আন্দোলন থেকে উঠে আসা দল হিসেবে তরুণ ভোটার ও আন্দোলনকেন্দ্রিক একটি শ্রেণির মধ্যে তাদের কিছুটা প্রভাব রয়েছে। সে কারণে জোটের মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে তৈরি হওয়া এই দ্বন্দ্ব চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের নির্বাচনী হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
তফসিল অনুযায়ী, ২১ জানুয়ারি মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনে জামায়াত প্রার্থী ডা. আবু নাছের আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায় তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বরাদ্দ পান। যদিও পরে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতে ইসলামী সংবাদ সম্মেলন করে তাকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয় এবং ২ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রকাশ্যে এনসিপি প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফের হাতে শাপলাকলি প্রতীক তুলে দিয়ে তাকে ১১ দলের প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।
তবে ভোটের আগমুহূর্তে গত চার দিন ধরে ডা. আবু নাছের নিজেই নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধন, গণসংযোগ, পথসভা ও ক্যারাভ্যানের মাধ্যমে তিনি নগরীর চান্দগাঁও, কাপ্তাই রাস্তার মাথা এবং বোয়ালখালী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালাচ্ছেন। এতে এনসিপি প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফ কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ দলটির নেতাকর্মীদের।
জামায়াতে ইসলামীর বোয়ালখালী উপজেলা আমির মোরশেদুল আলম বলেন, সাংগঠনিকভাবে আমরা এনসিপির প্রার্থীর পাশেই আছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জোবাইরুলকে এলাকায় খুব কম মানুষ চেনে। অন্যদিকে ডা. আবু নাছের একজন পরিচিত চিকিৎসক, তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। সাধারণ মানুষই তাকে আবার মাঠে নামতে বাধ্য করেছে।
এনসিপির প্রার্থীকে প্রতীক তুলে দেওয়ার পরও জামায়াতের প্রার্থী প্রচারণায় নামায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জুবাইরুল হাসান আরিফ। তিনি বলেন, জোটের পক্ষে স্থানীয় পর্যায়ে যে ধরনের সহযোগিতা পাওয়ার কথা, সেটি পাচ্ছি না। উল্টো তিনি (আবু নাছের) নিজে প্রচারণায় নেমেছেন। এতে ভোটারদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
এই দ্বন্দ্বের সুযোগ নিচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ। স্থানীয়দের মতে, জামায়াত ও এনসিপির ভোট ভাগ হলে ধানের শীষ এগিয়ে যাবে। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এরশাদ উল্লাহর প্রতি সাম্প্রতিক হামলার ঘটনার পর সহানুভূতিও কাজ করছে।
এদিকে, চট্টগ্রাম-৮ আসন নিয়ে তৈরি হওয়া এই সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে অন্যান্য আসনেও। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম-১৩ আসনে সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতের পক্ষে কাজ না করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে এনসিপি।
এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জুবাইরুল আলম বলেন, চট্টগ্রামে জোটের পক্ষ থেকে মাত্র একটি আসন এনসিপিকে দেওয়া হয়েছে। অথচ সেই আসনেই জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি। এতে আমাদের প্রার্থীর পক্ষে জামায়াতের নেতাকর্মীরা মাঠে নামেননি।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনে জামায়াত এনসিপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ শুরু না করা পর্যন্ত আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসনে জামায়াতের সঙ্গে আমরা কোনো ধরনের সহযোগিতায় যাবো না। অন্য আসনেও এমন ঘোষণা আসতে পারে। এ বিষয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য ঘোষণা প্রত্যাশা করছি।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনে জামায়াত এনসিপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ শুরু না করা পর্যন্ত আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসনে জামায়াতের সঙ্গে আমরা কোনো ধরনের সহযোগিতায় যাবো না। অন্য আসনেও এমন ঘোষণা আসতে পারে। এ বিষয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য ঘোষণা প্রত্যাশা করছি।
