অনিয়ম ও কোনো ধরনের অভিযোগ ছাড়াই চট্টগ্রামে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত নগরী ও জেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। দিনভর নারী-পুরুষ, তরুণ-প্রবীণদের উপস্থিতিতে অনেক কেন্দ্রেই ছিল উৎসবের আমেজ।
ভোরের আলো ফোটার আগেই নগরীর বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রগুলোর সামনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। বহদ্দারহাট, চকবাজার, কোতোয়ালী, বাকলিয়া থানা এলাকার বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, পুরুষ ও নারী ভোটাররা আলাদা লাইনে দাঁড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিচ্ছেন। পশ্চিম বাকলিয়া ডিসি রোড, দেওয়ান বাজার, সানরাইজ কেজি অ্যান্ড হাইস্কুল, কাজেম আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ডা. খাস্তগীর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও আঞ্চলিক লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ।
প্রার্থীদের ভাষ্য সুষ্ঠু ভোট হয়েছে :
চট্টগ্রাম-১১ আসনের বিএনপি প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী দুপুরে উত্তর কাট্টলী মুন্সিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দিয়ে বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে চলছে এবং কোথাও পক্ষপাতমূলক কিছু চোখে পড়েনি। দীর্ঘদিন পর মানুষ ভোট দিতে পারছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকের এই ভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার ফিরে পাবে।
চট্টগ্রাম-৯ আসনের জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী সকালে পাঁচলাইশ বাদুরতলা মডার্ন আইডিয়াল স্কুল কেন্দ্রে ভোট দেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর একটি সুন্দর পরিবেশে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যেন এ পরিবেশ বজায় থাকে, এটাই প্রত্যাশা। সুষ্ঠু নির্বাচনের ফলাফল সবাই মেনে নেবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
একই আসনের বিএনপি প্রার্থী আবু সুফিয়ান চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে বলেন, মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে পারছে, এটি আনন্দের বিষয়। চট্টগ্রাম-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরী বলেন, ১৭ বছর পর ভোট দিয়ে জীবনের প্রথম ভোটের মতো অনুভূতি হয়েছে। তিনি আশা করেন, সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে।
অচল দুই পা নিয়ে ভোট দেন নয়ন দাশ-রহিমা খাতুন
শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ভোট দিতে আসেন নগরীর বাসিন্দা নয়ন দাশ। জন্মের পর থেকেই দুই পা অচল হলেও হাতে ভর করে আঞ্চলিক লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এসে ভোট দেন তিনি। ভোট দিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ভোট আমার অধিকার। নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে এসেছি।
একইভাবে হুইলচেয়ারে করে শহীদ নগর সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন আশির্ধ্ব রহিমা খাতুন। ছেলে ও নাতনির সহায়তায় কেন্দ্রে এসে ভোট দিয়ে তিনি বলেন, ১৯৮৬ সালে প্রথম ভোট দিয়েছিলাম। এত বছর পর আবার ভোট দিতে পেরে খুব খুশি।
জীবনের প্রথম ভোট দিলেন তামিম ইকবাল:
চট্টগ্রাম-৯ আসনে ভোট দেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালও। আঞ্চলিক লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে তিনি বলেন, জীবনে প্রথম ভোট দিতে পেরে ভালো লাগছে। নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তামিম।
বৃদ্ধার মৃত্যু:
শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেও একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম-১৪ আসনের কাজীর দেহেরি বালক উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন মনু মিয়া (৭০)। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
আনোয়ারায় সংঘর্ষ:
চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা–কর্ণফুলী) আসনের বৈরাগ ইউনিয়নের গুয়াপঞ্চক উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে ধানের শীষ ও মোমবাতি প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে দুই পোলিং এজেন্টসহ অন্তত ছয়জন আহত হন। আহতদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রের বাইরে উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
সব মিলিয়ে দিনব্যাপী ভোটগ্রহণে চট্টগ্রামে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া অধিকাংশ কেন্দ্রেই শান্তিপূর্ণভাবে ভোট সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রার্থীরা। এখন সবার দৃষ্টি ভোটের ফলাফলের দিকে।
