back to top

চট্টগ্রামে ইফতার বাজারে স্বাস্থ্যঝুঁকি

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যের মিশ্রণ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৬ মার্চ, ২০২৬ ২৩:০১
[photo_card_and_fontsize]

চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন বেকারি ও রেস্তোরাঁয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। শুধু অপরিচ্ছন্ন পরিবেশেই নয়, খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগও মিলছে একের পর এক। বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে ইফতারের জনপ্রিয় খাবার তৈরিতে খাদ্যে ব্যবহার অনুপযোগী রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গত সাত দিনে চট্টগ্রাম নগরের অন্তত ১০টি খাদ্য উৎপাদনকারী বেকারি ও রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বারকোড সুইটস অ্যান্ড কনফেকশনারি ও মেরিডিয়ান রেস্তোরাঁর মতো পরিচিত নামও রয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, রমজানকে কেন্দ্র করে নগরের বিভিন্ন বেকারি ও রেস্তোরাঁয় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার উৎপাদন এবং খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি নগরের চকবাজার এলাকায় অবস্থিত কাচ্চি ডাইন নামের একটি রেস্তোরাঁয় জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযান চালায়। কর্মকর্তারা জানান, রেস্তোরাঁটির রান্নাঘরে ঢুকতেই তেলাপোকা ও ইঁদুরের অবাধ বিচরণ চোখে পড়ে। রান্নাঘরের পরিবেশ ছিল স্যাঁতসেঁতে ও অপরিচ্ছন্ন, যা খাদ্য উৎপাদনের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত।

এরপর ১ মার্চ মুরাদপুর এলাকায় অবস্থিত বারকোড সুইটস অ্যান্ড কনফেকশনারিতে অভিযান চালিয়ে একই ধরনের চিত্র দেখতে পান কর্মকর্তারা। সেখানে রান্নাঘরে তেলাপোকা ও ছারপোকার উপস্থিতি পাওয়া যায়। এ ছাড়া রান্নাঘরের ভেতর একটি বিড়ালের উপস্থিতিও দেখা যায়, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত বুধবার কালুরঘাট এলাকার বিএসপি ফুড প্রোডাক্টস প্রাইভেট লিমিটেডে অভিযান চালিয়েও রান্নাঘরে তেলাপোকার উপস্থিতি লক্ষ্য করেন কর্মকর্তারা। একইভাবে বৃহস্পতিবার গরীবুল্লাহ শাহ হাউজিং এলাকায় অবস্থিত হোম রেসিপি ফুড বেকারিতেও রান্নাঘরে তেলাপোকা পাওয়া যায়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিকবার অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে এবং সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু জরিমানা দেওয়ার পর অনেক প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে কিছুটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলেও পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। ফলে একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

অভিযানে জড়িত নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা ও ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু অস্বাস্থ্যকর পরিবেশই নয়, অনেক প্রতিষ্ঠান খাবার তৈরিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করছে। বিশেষ করে রমজানে জনপ্রিয় ইফতার আইটেম যেমন জিলাপি তৈরিতে খাদ্যে ব্যবহার অনুপযোগী রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার নগরের চকবাজার এলাকায় সাতকানিয়া ভাতঘর নামের একটি প্রতিষ্ঠানে জেলা প্রশাসন অভিযান চালায়। অভিযানের সময় সেখানে জিলাপি তৈরিতে ‘হাইড্রোজ’ বা সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইড ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।

জানা গেছে, সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইড মূলত পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত একটি রাসায়নিক, যা খাবারে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই রাসায়নিক দীর্ঘ সময় বা অতিরিক্ত মাত্রায় মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে কিডনির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এটি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং মেধাশক্তি দুর্বল করে দিতে পারে।

কর্মকর্তারা আরও বলেন, যে ড্রামে করে এই রাসায়নিক আনা হয়, সেখানেই স্পষ্টভাবে লেখা থাকে যে এটি ব্যবহারের সময় খাওয়া বা পান করা যাবে না। কারণ এটি বাতাসে ক্ষতিকর কণা ছড়ায়। অথচ সেই রাসায়নিকই খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।

এ ছাড়া খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়ানোর জন্য গোপালজল ও কেওড়াজলের মতো উপাদানও অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা খাদ্যে ব্যবহার নিষিদ্ধ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, শুধু জরিমানা দিয়ে এসব অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এমন অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি প্রয়োজন। প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে সিলগালা করে দেওয়া উচিত।