back to top

সন্ত্রাসী সাজ্জাদ গ্রুপের সদস্য হতে কোরআন ছুঁয়ে শপথ, ‘জীবন দেব, বেঈমানি করব না’

শপথের ভিডিওতে চাঞ্চল্যকর তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১১ মার্চ, ২০২৬ ১২:৪৫
[photo_card_and_fontsize]

কোরআনের ওপর হাত রেখে শপথ নিতে হয়। শপথের ভাষাও কঠোর। নিজের জীবনও দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই বেঈমানি করা যাবে না। এভাবেই নতুন সদস্যদের শপথ করিয়ে সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করা হতো চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে। পুলিশের হাতে ধরা পড়া সাজ্জাদের তিন সহযোগীর কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া একটি ভিডিওতে এমন শপথের দৃশ্য উঠে এসেছে।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া তিন সহযোগীর কাছ থেকে ওই ভিডিওটি উদ্ধার করা হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, নতুন সদস্যদের পবিত্র কোরআন শরিফ হাতে নিয়ে সাজ্জাদ বাহিনীর প্রতি আনুগত্যের শপথ করানো হচ্ছে।

সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, সাম্প্রতিক অভিযানে বড় সাজ্জাদ বাহিনীর তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় গুলির ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিলেন। গ্রেপ্তারদের কাছ থেকেই শপথের ভিডিওটি উদ্ধার করা হয়।

ভিডিওতে শপথের সময় একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘কোরআনের ওপর হাত রেখে বললাম, আমার জীবন আজকে থেকে সাজ্জাদ ভাইয়ের হাতে তুলে দিলাম। সাজ্জাদ ভাইয়ের জন্য যদি জীবন দিতে হয় জীবন দিব, মরব কিন্তু কখনো সাজ্জাদ ভাইয়ের সাথে বেঈমানি করব না।’

পুলিশ জানিয়েছে, এই ভিডিও ধারণ করে বিদেশে অবস্থানরত বড় সাজ্জাদের কাছে পাঠানো হতো। তার অনুমোদন পাওয়ার পরই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বাহিনীর সদস্য হিসেবে নিশ্চিত করা হতো।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও একটি কঠোর প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হতো। একজন পুরোনো ও বিশ্বস্ত সদস্যকে নতুন সদস্যের জন্য জামিনদার থাকতে হতো। শপথ গ্রহণের সময় ভিডিও ধারণ করা হলেও নিরাপত্তার স্বার্থে শপথকারীর মুখ ব্লার করে রাখা হতো।

বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ

কে এই সন্ত্রাসী সাজ্জাদ

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামীর চালিতাতলী এলাকার আবদুল গণির ছেলে সাজ্জাদ আলী। তার নাম প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৯৯ সালের ২ জুন পাঁচলাইশ ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খানকে হত্যার ঘটনায়। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত আলোচিত ওই হত্যাকাণ্ডেও তার নেতৃত্বের অভিযোগ রয়েছে। ২০০০ সালের ১ অক্টোবর একে–৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বড় সাজ্জাদ। পরে ২০০৪ সালে জামিনে কারাগার থেকে বের হয়ে বিদেশে পালিয়ে যান তিনি। এরপর থেকে বিদেশে অবস্থান করেই চট্টগ্রামের অপরাধজগত নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শুরুর দিকে নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন ও আকবর আলীকে নিয়ে তিনি দল গঠন করেন। তাদের হাতেই ছিল নগরের অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ। একটি অস্ত্র মামলায় ২১ বছর কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ম্যাক্সন পলাতক অবস্থায় ২০২২ সালের শেষের দিকে ভারতে মারা যান। সরোয়ারও পরে দল ছেড়ে দেন।

২০১৫ সালের পর থেকে দেশে সাজ্জাদ বাহিনীর নেতৃত্ব দেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ।

বিদেশে পলাতক বড় সাজ্জাদের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণকারী ছোট সাজ্জাদ

পুলিশ জানায়, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ২৫ জন সন্ত্রাসী সক্রিয় রয়েছেন। দেশে মূল নেতৃত্বে রয়েছেন ১৭ মামলার আসামি ছোট সাজ্জাদ। তিনি গত বছর কারাগারে যাওয়ার পর তার হয়ে ১৫ মামলার আসামি রায়হান নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

ব্যবসায়ীর বাসায় গুলির ঘটনায় সাজ্জাদের তিন সহযোগী গ্রেপ্তার

মঙ্গলবার রাত ১০টায় এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানিয়েছে, স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় গুলিবর্ষণের ঘটনায় বড় সাজ্জাদ বাহিনীর তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন- মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ওরফে রিমন, মো. মনির এবং মো. সায়েম।

বড় সাজ্জাদের তিন সহযোগী গ্রেপ্তার

গ্রেপ্তারদের মধ্যে রিমন ২০০০ সালের চাঞ্চল্যকর আট খুনের (এইট মার্ডার) মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আত্মগোপনে থেকে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরা এলাকায় ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশ পরা চারজন সশস্ত্র ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ওই বাসার কাছে এসে গুলি ছুড়তে থাকে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে, হামলায় অংশ নেওয়া চারজনের মধ্যে একজনের দুই হাতে দুটি পিস্তল ছিল। অন্য তিনজনের মধ্যে একজন সাব-মেশিনগান (এসএমজি), একজন চায়নিজ রাইফেল এবং অন্যজন শটগান ব্যবহার করে গুলি চালায়।

দুবাইয়ে বসে অপরাধচক্র পরিচালনা

পুলিশের তথ্যমতে, গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনই দুবাইয়ে পালাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের নির্দেশে চট্টগ্রাম নগরে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিল।

তাদের কার্যক্রমের মধ্যে ছিল— খুনের পরিকল্পনা, চাঁদাবাজি ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ। গ্রেপ্তার হওয়া রিমনকে সাজ্জাদের প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে উল্লেখ করেছে পুলিশ।

চাঁদার দাবিতে একাধিকবার হামলা

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, দুবাইয়ে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ দীর্ঘদিন ধরে তার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিল। প্রথমে তার কাছে ১০ কোটি টাকা দাবি করা হয়। পরে সেই দাবি কমিয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করা হয়।

ওই ব্যবসায়ী জানান, চলতি বছরের ২ জানুয়ারিও তার বাসায় গুলি চালানো হয়েছিল। এরপরও চাঁদা না দেওয়ায় তাকে হুমকি দেওয়া অব্যাহত ছিল। সর্বশেষ গুলির ঘটনার প্রায় ২০ দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে তাকে একটি বার্তা পাঠানো হয়। সেই বার্তায় লেখা ছিল- ‘ওয়েট অ্যান্ড সি।’ এরপরই ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে তার বাসায় আবার গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।

পুলিশ বলছে, এই ঘটনার পেছনে চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যই মূল কারণ বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

অভিযানে উদ্ধার তিন আগ্নেয়াস্ত্র

পুলিশ জানায়, ঘটনার তদন্তে প্রথমে চকবাজার থানা পুলিশ রিমনকে গ্রেপ্তার করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি বিদেশি রিভলভার ও ৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এই অস্ত্রটি আগে পাহাড়তলী থানা থেকে লুণ্ঠিত হয়েছিল।

পরবর্তীতে রিমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাঁচলাইশ থানার বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে মনিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। মনিরের তথ্য অনুযায়ী ডবলমুরিং থানা থেকে লুট হওয়া একটি ব্রাজিলিয়ান টরাস ৯ এমএম পিস্তল এবং একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

এরপর মনিরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সায়েমকে গ্রেপ্তার করা হয়। সায়েমের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী খুলশী থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি সাব-মেশিনগান (এসএমজি), দুটি ম্যাগাজিন এবং ৫০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী জানান, সায়েম এই অস্ত্র পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে কিনেছিল। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলো ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় গুলিবর্ষণের ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছিল। বিষয়টি নিশ্চিত করতে ব্যালিস্টিক পরীক্ষা করা হবে।