মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে এখনো স্বস্তি ফেরেনি। চট্টগ্রামের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম এখনো ঊর্ধ্বমুখী। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার না হলে সামনে কোরবানির বাজারে এর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। এতে ভোগ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বেড়ে যায় শিপমেন্ট খরচ। এর প্রভাব পড়ে আমদানিনির্ভর প্রায় সব ধরনের ভোগ্যপণ্যে। গত এক মাসে ভোজ্যতেল, চিনি ও মসলাজাত পণ্যের দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
রমজান ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আগেভাগে পর্যাপ্ত মজুত থাকায় বাজারে তাৎক্ষণিক চাপ দেখা যায়নি। তবে ঈদের ছুটি শেষে সেই জমে থাকা প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগের উচ্চ ব্যয় কাঠামোর কারণে যুদ্ধবিরতির ইতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়তে সময় লাগছে।
খাতুনগঞ্জে সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা দেখা গেছে আমদানিনির্ভর মসলাজাত পণ্যে। ইরানি জাফরানের দাম কেজিতে বেড়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকায় পৌঁছেছে। আগে যেখানে গ্রামপ্রতি ১৫০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা ৫০০ টাকায় উঠেছে। একইভাবে ফিটকিরির দাম টনপ্রতি ৩০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। টক আলু, সাগু ও আলুবোখারার মতো পণ্যেও উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে।
এ ছাড়া কিশমিশ, জিরা, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, জয়ত্রী ও জায়ফলের মতো মসলার দামও বেড়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং রেট বৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়াই এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ।
ভোজ্যতেল ও চিনির বাজারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেল, পাম অয়েল ও সুপার পাম অয়েলের দাম মণপ্রতি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। চিনির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬২০ টাকায়। একই সঙ্গে গম ও বিটুমিনের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে নির্মাণ ও খাদ্য খাতে প্রভাব ফেলছে।
পরিবহন খরচ বৃদ্ধিও বাজারে চাপ বাড়াচ্ছে। স্থলবন্দর থেকে খাতুনগঞ্জ এবং সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় পণ্য পরিবহনে ট্রাকপ্রতি ভাড়া ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, হিলি বন্দর থেকে ১৫ টনের একটি ট্রাকে ডাল পরিবহনের ভাড়া ২৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪২ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত হচ্ছে।
তবে বাজারে সব পণ্যে একই ধরনের চাপ নেই। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় পেঁয়াজ, রসুন ও আদার বাজার এখনো তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এসব পণ্যের ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদন ও বিকল্প উৎস থাকায় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব কম পড়েছে।
খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস মিয়া জানান, কিছু পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকলেও সামগ্রিক বেচাকেনা প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে গেছে। বাজারে এখনও বাড়তি আমদানিনির্ভর পণ্য। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে কোরবানির বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে।
