back to top

সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যােগ, ক্ষুব্ধ চট্টগ্রামবাসী

আন্দোলনের মুখে ২০২২ সালে পিছু হঁটেন শেখ হাসিনা  

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ০২:০৯
[photo_card_and_fontsize]

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ‘ফুসফুস’ খ্যাত সিআরবি এলাকায় বেসরকারি বাণিজ্যিক হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল ভারতে পালিয়ে যাওয়া হাসিনা সরকার। দলমত নির্বিশেষে চট্টগ্রামের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের আন্দোলনের মুখে পরিবেশ ধ্বংসকারী এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। একই প্রকল্প পুনরায় বাস্তবায়নের উদ্যোগের খবরে প্রতিবাদ জানিয়েছেন চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে জোর সমালোচনা। এমন পরিবেশ ধ্বংসকারী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় কঠোর আন্দোলন ও আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ডাকা হয়েছে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি। একটি মিমংসিত বিষয় নিয়ে বিএনপি সরকার কেন বিতর্কে যাচ্ছে সেই প্রশ্ন তুলে এই অপতৎপরতা থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে চট্টগ্রামের সচেতন মহল।

জানা গেছে, গতকাল শনিবার দুই দিনের চট্টগ্রাম সফরে আসেন সড়ক পরিবহন ও রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। আজ রবিবার বিকাল চারটায় সিআরবি  (সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং) এলাকায় প্রস্তাবিত হাসপাতালের জায়গা পরিদর্শন করবেন তিনি। বিষয়টি জানাজানি হলে চট্টগ্রামের সচেতন মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সামাািজক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার পাশাপাশি সিআরবি রক্ষার ডাক দিয়েছেন। তারা বলছেন, হাসপাতালের আড়ালে একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে রেলের জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এখানে তারা বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তুলবেন। এতে সিআরবির সবুজ গাছপালা কাটা পড়বে, সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হবে।

সূত্র জানায়, ২০২১ সালের জুলাই মাসে এ প্রকল্পের জমি হাসপাতাল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রতিবাদ ও আন্দোলন শুরু হয়। টানা ১৫ মাস ধরে সেই আন্দোলন চলে। সেই আন্দোলনে ‘নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রাম’ এবং ‘সিআরবি রক্ষা মঞ্চ’সহ বেশ কিছু সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশ নিয়েছিল। পাশাপাশি চট্টগ্রামের বিএনপি নেতারাও হাসপাতাল বিরোধী নানা কর্মসূচি পালন করেছিলেন।  এক পর্যায়ে তখনকর আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতা সিআরবিতে হাসপাতাল না করার পক্ষে অবস্থান নেন। টানা ৪৮০ দিন ধরে চলা সেই আন্দোলনের মুখে এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ সরকার সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে না বলে ঘোষণা দেয়। এরপর ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে সেই আন্দোলন শেষ হয়।

এদিকে আজ রবিবার সকাল ১০টায় সিআরবি এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছে সিআরবি রক্ষা মঞ্চ। সংগঠনের আহ্বায়ক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান আমাদের সময়কে জানান, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আমরা মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। পরে বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, হাসপাতালের জন্য অনেক জায়গা আছে, সিআরবির সবুজ পরিবেশ নষ্ট করে করতে হবে কেন। বাণিজ্যিক ওই কোম্পানীর উদ্দেশ্য ভিন্ন মন্তব্য করে তিনি বলেন, মূলত হাসপাতারের আড়ালে রেলের জায়গা খেয়ে ফেলা হলো উদ্দেশ্য; সেখানে তারা বাণিজ্যিক কমপ্লেক্সে পরিনত করবে।

সিআরবি এলাকাটির অবস্থান চট্টগ্রাম-৯ সংসদীয় আসনের মধ্যে; এখানকার স্থানীয় সংসদ সদস্য নগর বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান। ২০২১ সালের আন্দোলনে তিনিও হাসপাতালের বিরোধীতা করেছিলেন। বর্তমানেও বাণিজ্যিক স্থাপনা বিরোধী অবস্থানেই আছেন বলে জানিয়েছেন আবু সুফিয়ান। তিনি বলেন, আমরা আগেও বিরোধীতা করেছি; এখনো হাসপাতালের নামে কোন বাণিজ্যিক স্থাপনা চাই না।

রেলমন্ত্রী হাসপাতলের জায়গা পরিদর্শনে এলেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কিছুই জানে না। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) সুবক্তগীন বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। প্রকল্প বাস্তাবায়নকারী সংস্থাও অবগত নয় বলে জানান। ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজের অ্যান্ড কোম্পানী লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) কায়েস খলিল খান বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে প্রকল্প বাতিল হয়েছে এমন কোন সিদ্ধান্ত রেলওয়ে আমাদের জানায়নি। তাই হয়তো পিপিপি কর্তৃপক্ষ এবং রেলওয়ে বিষয়টি সামনে এনেছে।

বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবাদ: 

চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত সিআরবি এলাকায় আবারও হাসপাতাল প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রাম। প্রকল্পটি স্থায়ীভাবে বাতিলের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। এই সংগঠনের আন্দোলনের মুখেই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে সরে এসেছিল।

সিআরবিতে প্রাকৃতিক পরিসর ধ্বংস করে হাসপাতাল চায় না পরিবেশবাদী সংগঠন পিপলস ভয়েস। সিআরবিতে হাসপাতালের নামে নতুন করে স্থাপনা নির্মাণের চক্রান্ত বন্ধের দাবি জানিয়েছে বাসদ (মার্কসবাদী)। ঔষধি গাছে ভরপুর প্রাকৃতিক হাসপাতাল খ্যাত সিআরবিতে যান্ত্রিক হাসপাতাল নির্মাণ করা যাবে না জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকগণ।

বিবৃতিদাতারা হলেন, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ, একুশে ও বাংলা একাডেমি পদক প্রাপ্ত সাংবাদিক, কবি ও প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন, চুয়েটের সাবেক ভিসি প্রফেসর মোজাম্মেল হক, সিডিএ বোর্ড সদস্য ও নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি জেরিনা হোসেন, স্থপতি সুভাষ বড়–য়া।

সিআরবি এলাকাতে হাসপাতাল বা অন্য কোন অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ আইনানুগভাবে মোকাবিলা করবে মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ)। সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের পাঁয়তারা জনতা রুখে দেবে জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি।

২০১২-২০১৩ সালের দিকে প্রকল্প প্রস্তাবের পর থেকে যাচাই-বাছাই শেষে ২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি সিসিইএ কমিটির বৈঠকের পর ১৩ ফেব্রুয়ারি পিপিপি প্রকল্পটি একনেকে পাস হয়। ২০২০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সিআরবি এলাকায় পিপিপির অধীনে ইউনাইটেড গ্রুপের হাসপাতাল প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। করোনা পরিস্থিতিতে প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ থমকে যায়। ২০২১ সালের মে মাসে কাজ শুরু করতে গেলে হাসপাতাল বিরোধী আন্দোলনে নামে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ।

এই প্রকল্পের পরিকল্পনা ও সহযোগী সংস্থা বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব কর্তৃপক্ষ (পিপিপি)। কার্যনির্বাহী সংস্থা বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করবে ‘ইউনাইটেড চট্টগ্রাম হাসপাতাল লিমিটেড’। প্রকল্প বাস্ত—বায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে ১২ বছর। প্রকল্পের আওতায় ১০০ আসনের একটি মেডিকেল কলেজ, ৫০ আসনের একটি নার্সিং ইনস্টিটিউট এবং দুই ধাপে মোট ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। এতে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা খরচ হবে। ৫০ বছর পর প্রকল্পের পুরো মালিকানা পাবে  রেলওয়ের। ওই চুক্তির পর প্রজেক্ট ডেভেলপমেন্ট এবং প্রিমিয়াম বাবদ রেলওয়েকে প্রায় আট কোটি টাকা পরিশোধ করেছিল ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ।