চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বের জেরে কলেজছাত্র আশফাক কবির সাজিদ (১৭) হত্যার ঘটনা ঘটেছে। মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধ থেকে এ হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত বলে জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ছয় আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১২ এপ্রিল বিকেলে আশফাককে তার বন্ধু ফারদিন হাসান ফোনে ডেকে বাকলিয়া একসেস রোডের মৌসুমি আবাসিক এলাকার মোড়ে নিয়ে যান। সেখানে কথা বলার সময় একদল কিশোর তাকে জোর করে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় আশফাক তাদের হাত থেকে বাঁচতে একটি নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে ঢুকে গেট বন্ধ করে দেন এবং দৌড়ে আটতলায় উঠে যান। তবে হামলাকারীরা ভবনের গেটে ধাক্কা দিলে নিরাপত্তাকর্মী এনামুল হক গেট খুলে দেন। পরে তারা ওপর তলায় গিয়ে আশফাককে মারধর করে এবং একপর্যায়ে আটতলা থেকে লিফটের ফাঁকা স্থানে ফেলে দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশ জানায়, ঘটনার দুই দিন আগে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী এনায়েত উল্লাহর অনুসারী মো. রিদুয়ানের একটি মুঠোফোন কিশোর গ্যাং নেতা আবদুল কাদেরের অনুসারীরা কেড়ে নেয়। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে সংঘবদ্ধ হামলার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত আশফাক কাদেরের অনুসারীদের সঙ্গে চলাফেরা করত বলে জানা গেছে। যদিও পরিবার দাবি করেছে, তিনি কোনো কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এনায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, মাদক, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৮টি মামলা রয়েছে। তার সহযোগী আইমন ও আবদুল কাদেরের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে। উভয় পক্ষই কিশোর গ্যাং পরিচালনার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
চকবাজার থানার ওসি বাবুল আজাদ বলেন, প্রাথমিক তদন্তে মুঠোফোন কেড়ে নেওয়াকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ডের সূত্র পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং চারজনকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। আদালত এ বিষয়ে শুনানির দিন নির্ধারণ করেছেন।
সক্রিয় ২০০ কিশোর গ্যাং :
নগরীতে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) এক জরিপে দেখা গেছে, নগরীতে বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে প্রায় ২০০টি কিশোর গ্যাং। গত ছয় বছরে সংঘটিত অন্তত ৫৪৮টি অপরাধে এসব গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, নগরীর প্রায় প্রতিটি এলাকায় কিশোর গ্যাং সদস্যরা লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া দেয়। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আধিপত্য বিস্তার এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এখন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
একাধিক সূত্রের দাবি, এসব গ্যাংয়ের পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিত ‘বড় ভাইদের’ পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। তাদের ছত্রছায়ায় কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, ফলে আইন প্রয়োগেও নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক নজরদারির অভাব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দুর্বল তদারকি, মাদকাসক্তি, সামাজিক অবক্ষয় এবং সংগঠিত অপরাধী চক্রের প্রভাব কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রধান কারণ।
জানতে চাইলে মহানগর অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। ইতিমধ্যে অনেক গ্যাং সদস্যকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সব স্তরের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
