গোখাদ্য, ওষুধ, শ্রমিকের মজুরি ও জ্বালানি ব্যয়- সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামে কোরবানির পশু উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি বছর জেলায় স্থানীয়ভাবে হৃষ্টপুষ্ট গবাদিপশুর সংখ্যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন নেমে এসেছে। এবার উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব কোরবানির বাজারে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যদিও জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, উৎপাদন কমলেও কোরবানির সময় বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, প্রতি বছরই চট্টগ্রামের ঘাটতি পূরণে দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক গবাদিপশু আসে। এবারও বগুড়া, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পশু সরবরাহের মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর চট্টগ্রাম মহানগর ও উপজেলার খামারগুলোতে মোট ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৬০ হাজার ৮৮২। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে ৭৭ হাজার ৭৩১টি।
পরিসংখ্যান বলছে, উৎপাদনের এই নিম্নমুখী প্রবণতা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি, তবে এবারের পতনটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। ২০২৪ সালে উৎপাদন ছিল ৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৫৯টি, ২০২৩ সালে ৮ লাখ ৪২ হাজার ১৬৫টি এবং ২০২২ সালে ৭ লাখ ৯১ হাজার ৫০১টি। গত কয়েক বছরের এই ওঠানামার মধ্যে চলতি বছরই সবচেয়ে কম উৎপাদন হয়েছে।
পশুভিত্তিক হিসাবেও একই চিত্র ফুটে উঠেছে। এ বছর গরু উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৯৯ হাজার ২৭৯টিতে, যা গত বছর ছিল ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৮১৩। ছাগল উৎপাদন কমে হয়েছে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৫১৯টি, যেখানে গত বছর ছিল ২ লাখ ৫১ হাজার ৭৪। মহিষের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৮৩৪, গত বছর যা ছিল ৬৪ হাজার ১৬৩। ভেড়ার উৎপাদনও কমে হয়েছে ৪১ হাজার ৪২৩টি, যা গত বছর ছিল ৫৫ হাজার ৬৯৭।
খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ গোখাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। তাদের অভিযোগ, বাজারে তদারকির ঘাটতির সুযোগে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে অনেক ক্ষেত্রে গোখাদ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পশুর ওষুধ, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়।
মিরসরাই উপজেলার খামারি আজগর আলী বলেন, আগে যে খরচে একটি পশু হৃষ্টপুষ্ট করা যেত, এখন সেই খরচ অনেক বেড়ে গেছে। একজন শ্রমিকের পেছনে মাসে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত খরচ হয়। সব মিলিয়ে খামার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গোখাদ্যের দামও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব স্থানীয় পর্যায়েও পড়েছে। ফলে অনেক খামারি এবার পশুর সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন কিংবা হৃষ্টপুষ্টকরণে কম বিনিয়োগ করেছেন।
জানা গেছে, চট্টগ্রামে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৪ হাজার ২৫৮টি খামার রয়েছে। এর বাইরে মৌসুমি ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অসংখ্য অস্থায়ী খামারও রয়েছে। মিরসরাই, পটিয়া, সীতাকু-, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপজেলায় কোরবানির পশু উৎপাদন তুলনামূলক বেশি হয়। তবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এসব এলাকার অনেক খামারি আগের তুলনায় কম পশু লালন-পালন করেছেন।
খামারিরা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় কমাতে এবং খামার খাতকে টিকিয়ে রাখতে গোখাদ্যের বাজারে কার্যকর তদারকি জরুরি। পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা দেওয়া গেলে খামারিরা আবার উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত হবেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, এ বছর চট্টগ্রামে কোরবানির উৎপাদন কমেছে। তবে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পশু আসায় এই ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়। এবারও একইভাবে সরবরাহ নিশ্চিত হবে বলে আমরা আশা করছি।
