back to top

মাউন্ট মাকালুর দুর্গমতার গল্প শোনালেন বাবর আলী

প্রকাশিত: ১৭ মে, ২০২৬ ১৩:৩৪
[photo_card_and_fontsize]

আট হাজার মিটার (২৬,২৪৬ ফুট) বা ততোধিক উচ্চতার পর্বত আছে পৃথিবীতে চৌদ্দটি। ২০২৫ সাল পর্যন্ত এর চারটি পর্বতের চূড়া ছুঁয়েছিলেন এভারেস্টজয়ী বাবর আলী। কোনো বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে এই কীর্তি একমাত্র বাবর আলীর। গত ২ মে বাংলাদেশ সময় ভোর ০৫:৪৫ টায় নিজের পঞ্চম আট হাজারি পর্বত হিসেবে স্পর্শ করেছেন পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাউন্ট মাকালুর শিখর। নেপালের মহালাঙ্গুর হিমালয়ে অবস্থিত ৮,৪৮৫ মিটার (২৭,৮৩৮ ফুট) উচ্চতার এই পর্বতে এটিই প্রথম বাংলাদেশি সাফল্য।

আজ রবিবার বাবর আলী গল্প শোনান এক্সপিডিশন মাকালুঃ দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার শীর্ষক এই ঐতিহাসিক অভিযানের। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে অভিযান পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন ও পতাকা প্রত্যর্পণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে অভিযানের আয়োজক পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স। এতে পর্বতারোহী বাবর আলী ছাড়াও পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ভিজুয়াল নিটওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ নুর ফয়সাল উপস্থিত ছিলেন। তিনি সামনের দিনগুলোতেও বাবর আলীর পাশে দাঁড়ানোর আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এই অভিযানে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সামুদা স্পেক-কেম লিমিটেড সম্পৃক্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন উক্ত প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড ম্যানেজার ইমতিয়াজ ইবনে ইমাম।

প্রসঙ্গত, এই দুঃসাহসিক অভিযানে আরো পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন, মাই হেলথ ও রহমান গ্রোসারিজ। এই অনুষ্ঠানে ক্লাবের সভাপতি ফরহান জামান বলেন, বিশ্বের পঞ্চম শীর্ষ পর্বত মাকালুতে বাবরের সৌজন্যে উড়ল আমাদের গর্বের লাল-সবুজ পতাকা। ব্যাপারটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য বিশাল গর্বের। আমরাও যে পর্বতারোহণ নামক স্পোর্টসে দারুণ কিছু করে দেখাতে পারি, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বাবর। সামনের দিনগুলোতেও ওর কাছ থেকে দারুণ সব আরোহণের দেখা পেতে উন্মুখ হয়ে আছি। যথাযপথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তিনি পর্বতারোহণ নামক এই স্পোর্টসের মাধ্যমে দেশকে অনন্য জায়গায় নিয়ে যেতে পারবেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ নিতে অভ্যস্ত বাবর আলী এরচেয়েও উঁচু ও দুর্গম পর্বত আরোহণ করেছেন। কিন্তু মাউট মাকালু তুলনামূলকভাবে বেশি দুর্গম আখ্যা দিয়ে বাবর আলী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, যদিও এ বছর আমার ইচ্ছে ছিল কারাকোরাম হিমালয়ে অবস্থিত বিশ্বের নবম উচ্চতম শৃঙ্গ নাঙ্গা পর্বত আরোহণের। কিন্তু অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় টাকার স্বল্পতা ও নানান কারণে আমি শেষ মুহূর্তে পাখির চোখ করি মাউন্ট মাকালুকে। পূর্বে আরো বেশ কয়েকটা আট হাজার মিটার আরোহণ করলেও এই পর্বতের মতো ঠান্ডা আর হাওয়ার কামড়ের মুখোমুখি কোথাও হতে হইনি। এই ভয়াবহ ঠান্ডা আর হাড় হিম করা বাতাসের জন্য এই পর্বতে কাটানো প্রতিটা মিনিটই ছিল এক অর্থে কঠিন। আর মাকালু পর্বত আবহাওয়ার দিক থেকেও খুবই রহস্যময় আচরণ করেছে পুরো অভিযানজুড়েই। এখানের আবহাওয়া খুব দ্রুতই পরিবর্তিত হয়। এর সাথে মানিয়ে নেওয়াটা সহজ নয় অনেকাংশেই।

বাবর আলী বলেন, এই অভিযানেই আমি হারিয়েছি আমেরিকান বন্ধু শেলি জোহানসেনকে। চূড়া আরোহণ শেষে নেমে আসার পথে তুষারধসে পড়ে প্রাণ হারান শেলি। আমার আরেক বন্ধু রাশিয়ান কন্সট্যান্টিন শিকার হয়েছে তুষারক্ষতের। ওর সাথে এই অভিযানে সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছি আমি। হাত-পায়ের বেশ অনেকগুলো আঙুল তুষারক্ষতের কারণে হারিয়েছে ও। পর্বত মাঝে মাঝেই খুবই অন্যায্য আচরণ করে। সব মিলিয়ে এই পর্বত আরোহণের অনুভূতি খুবই মিশ্র। লাল-সবুজ পতাকা হাতে আরোহণের আনন্দ যেমন আছে, তেমনি এই দুর্ঘটনাগুলো নিয়ে অসম্ভব খারাপ লাগাও আছে। যাহোক, প্রতিটা পর্বত চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা হাতে এই মাটির কেউ দাঁড়ালে, দেশটাও তাঁর সাথে কিছুটা হলেও উপরে ওঠে বলে আমি বিশ্বাস করি। আশা করি, পরের পর্বতারোহীরাও সেই ধারা অব্যাহত রাখবে।

পর্বতে যাওয়াটা তো কোন খেয়ালি ব্যাপার কিংবা দিবাস্বপ্ন নয় উল্লেখ করে বাবর আলী বলেন, এর পেছনে দীর্ঘ সাধনা আর প্রস্তুতির ব্যাপার আছে। প্রস্তুতির ব্যাপারটাতে সবাই যাতে আরো বেশি মনোযোগ দেয়, সেই প্রত্যাশা থাকবে আমার। আর আমি চাই ১৪টি আটহাজারি শৃঙ্গের সবকটিতেই চড়তে। সবেমাত্র ৫টি হলো, বাকি আছে আরও ৯টি। আশা করি পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে লাল-সবুজ পতাকা হাতে বাকি ৯টি পর্বতের চূড়ায়ও আমি দাঁড়াতে পারব।’

‘গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান’ বা ‘মহা-কালো’ খ্যাত এই চূড়া আরোহণের উদ্দেশ্যে বাবর ৭ এপ্রিল দেশ ছাড়েন। আনুষাঙ্গিক প্রস্তুতি শেষে তিনি ৯ এপ্রিল বিমানে উড়ে যান টুমলিংটার এবং সেখান থেকে গাড়িতে সেদুয়া গ্রামে। এরপর পায়ে চলা শুরু করে ১৭ এপ্রিল পৌঁছান পর্বতের উচ্চতর বেস ক্যাম্পে। এরপর উচ্চতার সাথে শরীরকে মানিয়ে নিতে ২১ এপ্রিল তিনি ক্যাম্প-১ ও পরদিন ক্যাম্প-২ তে ঘুমিয়ে ৭,০০০ মিটার উচ্চতা ছুঁয়ে বেসক্যাম্পে নেমে আসেন । দ্বিতীয় দফায় ২৭ এপ্রিল তিনি ক্যাম্প-২ এ একদিন কাটিয়ে পরদিন নেমে আসেন বেসক্যাম্পে। এরপর শুরু হয় ভালো আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষার পালা। আবহাওয়া কিঞ্চিৎ সদয় হওয়ার আভাস পেয়ে বাবর আবার পর্বতে চড়তে শুরু করেন ৩০ এপ্রিল। ওই দিন তিনি সরাসরি উঠে যান ৬৬০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-২ এ এবং পরদিন উঠেন ৭৪০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-৩ এ। বিকালটা সেখানেই অপেক্ষা করে মাঝরাতে তিনি বেরিয়ে পরেন শিখরের উদ্দেশে। একটানা ১১০০ মিটারের অধিক ভয়ানক চড়াই অতিক্রম করে তিনি ভোরে পৌঁছে যান শিখরে। আরোহণ শেষে সেদিনই তিনি লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে বেসক্যাম্পে নেমে আসেন।

বাবর আলী ২০১৪ সালে পর্বতারোহণ শুরু করেন। চট্টগ্রামের পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বর্তমান সাধারণ সম্পাদক তিনি। এই ক্লাবের হয়েই গত বারো বছর হিমালয়ের নানান শিখরে অভিযান করেছেন। ২০২২ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে হিমালয়ের আমা দাবলাম (২২,৩৪৯ ফুট) আরোহণ করেন। ২০২৪ সালে একই অভিযানে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (২৯,০৩৫ ফুট) ও চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট লোৎসে (২৭,৯৪০ ফুট) আরোহণ করেন। একই অভিযানে দুটি আট হাজার মিটার পর্বত আরোহণের কৃতিত্ব নেই আর কোন বাংলাদেশি পর্বতারোহীর। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি আরোহণ করেন বিশ্বের দশম সর্বোচ্চ পর্বত অন্নপূর্ণা-১ (২৬,৫৪৫ ফুট)। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি কৃত্রিম অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়াই আরোহণ করেন বিশ্বের অষ্টম উচ্চতম পর্বত মাউন্ট মানাসলু (২৬,৭৮১ ফুট)।