back to top

বিদায়ের দিনে ভালোবাসার বন্ধনে সিক্ত শিক্ষক

৩৮ বছর ৭ মাসের শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানলেন আলাউদ্দিন ভূঁইয়া

প্রকাশিত: ১৮ জুন, ২০২৬ ০৭:৩৮
[photo_card_and_fontsize]

একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই দেন না, তিনি গড়ে তোলেন মানুষ, নির্মাণ করেন ভবিষ্যৎ। হাজারো শিক্ষার্থীর শৈশব, কৈশোর ও স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাঁর স্মৃতি। দীর্ঘ ৩৮ বছর ৭ মাস ধরে সেই দায়িত্ব পালন করে অবশেষে অবসরে গেলেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের মহানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ভূঁইয়া।

গত ১৫ মে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। তবে চাকরির শেষ দিনে দায়িত্বের ইতি টানলেও শিক্ষক হিসেবে তাঁর পথচলার শেষ হয়নি। কারণ একজন শিক্ষকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর কর্মজীবনের সীমারেখার মধ্যে আটকে থাকে না; তিনি বেঁচে থাকেন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে, সহকর্মীদের শ্রদ্ধায় এবং সমাজের ভালোবাসায়।

বক্তব্য রাখছেন আমন্ত্রিত অতিথিরা

এই ভালোবাসারই এক উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার। মহানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (এসএমসি) ও পিটিএ সদস্যরা তাঁকে বিদায় জানাতে আয়োজন করেন এক আন্তরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের। সেখানে আবেগ, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার মিশেলে তৈরি হয় এক স্মরণীয় পরিবেশ।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সীতাকুণ্ডের সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুহাম্মদ ফারুক হোসাইন। প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম রহমান চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে অংশ নেন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইকবাল হুসাইন, মোহাম্মদ মহসিন ও দীপক কান্তি ভট্টাচার্য, অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম, প্রধান শিক্ষক রাশেদ খান মেনন, সালাউদ্দিন মাহমুদ, নুরুল আমিন ও আব্দুল মজিদ এবং ইউআরসির ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নাসির উদ্দীন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সাদিয়া সুলতানা।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, একজন শিক্ষক তাঁর কর্মজীবনে কতটা সফল হয়েছেন, তা পদ বা পুরস্কার দিয়ে সব সময় পরিমাপ করা যায় না। শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও অভিভাবকদের হৃদয়ে তিনি কতটা জায়গা করে নিতে পেরেছেন, সেটিই একজন শিক্ষকের প্রকৃত অর্জন। আলাউদ্দিন ভূঁইয়ার বিদায় অনুষ্ঠানে সবার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ও আবেগই তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসার প্রমাণ।

বক্তব্য দিচ্ছেন আলাউদ্দিন ভূঁইয়া

অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আলাউদ্দিন ভূঁইয়া। তিনি বলেন, শিক্ষকতা তাঁর কাছে কখনো চাকরি ছিল না, ছিল এক ধরনের সাধনা। দীর্ঘ পথচলায় সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা ও সহযোগিতা পেয়েছেন, সেটিই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বিদায়ের এই আয়োজনে তিনি সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

শিক্ষকতা জীবনের শুরু হয়েছিল প্রায় চার দশক আগে। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, অসংখ্য শিক্ষার্থীকে আলোর পথে এগিয়ে দিয়ে তিনি এগিয়ে গেছেন দায়িত্বের পথে। পরে ২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর পদোন্নতি পেয়ে মহানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়ন, শৃঙ্খলা ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে জানান সহকর্মীরা।

কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি হয়তো দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন, কিন্তু তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও অবদান থেকে যাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। বিদায়ের দিনে তাই ছিল না শুধু আনুষ্ঠানিকতা; ছিল একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতার এক উজ্জ্বল প্রকাশ।