ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারের শেষদিন ছিল সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি)। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, তার আগের দিনই বন্দরনগরীর রাজপথ, অলিগলি ও জনবহুল এলাকায় ছিল মিছিল, জনসভা, পথসভা ও গণসংযোগের সরব উপস্থিতি। দীর্ঘ সময় পর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে ঘিরে শেষমুহূর্তে এসে ভোটের আমেজ ফিরে এসেছে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা।
প্রচারের শেষদিন সকাল থেকেই বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), সিপিবি-বাসদসহ বামপন্থী দল, ইসলামিক ফ্রন্ট ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও সমর্থকেরা মাঠে নামেন। কেউ হেঁটে হেঁটে ভোট চান, কেউ মিছিলের নেতৃত্ব দেন, আবার কেউ সংবাদ সম্মেলন ও জনসভার মাধ্যমে নিজেদের নির্বাচনি অঙ্গীকার তুলে ধরেন। কোথাও কোথাও উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয় বাদ্যবাজনা ও স্লোগানে।
নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও একযোগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ১১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, সিপিবি, বাসদ, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এলডিপি, খেলাফত মজলিস, ইসলামিক ফ্রন্টসহ একাধিক দলের প্রার্থীরা রয়েছেন।
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনের বিএনপির প্রার্থী ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সকালে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ১১ দফা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন। বিকেলে তিনি নগরীর লালদিঘী মাঠে চট্টগ্রাম-৯ আসনের বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ানের জনসভায় অংশ নেন। সেখানে তিনি নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্র পাহারায় সতর্ক থাকার আহ্বান জানান এবং ভোট কারচুপি রোধে ‘জাগ্রত সৈনিক’ হিসেবে ভূমিকা রাখার নির্দেশ দেন। জনসভা শেষে তিনি নিজ নির্বাচনি এলাকায় গণসংযোগ ও মিছিলে অংশ নেন। এদিন তার ছেলে বিএনপি নেতা ইসরাফিল খসরুও দিনভর প্রচারণায় সক্রিয় ছিলেন।
চট্টগ্রাম-৯ আসনের বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান সকালে বাকলিয়া এলাকায় গণসংযোগ করেন। বিকেলে জনসভা শেষে কোতোয়ালি এলাকায় ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় ওই আসনে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি মিছিলও দেখা যায়, যারা তার পক্ষে সমর্থন জানান।
চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-হালিশহর-খুলশী) আসনের বিএনপির প্রার্থী সাঈদ আল নোমানও শেষদিনে মিছিল ও সমাবেশ করেন। বিভিন্ন পথসভায় তিনি দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচনি মাঠে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
১১ দল সমর্থিত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের প্রচারণাও ছিল চোখে পড়ার মতো। চট্টগ্রাম-১০ আসনের প্রার্থী শামসুজ্জামান হেলালী হালিশহরে হাজারো নারীর অংশগ্রহণে একটি মহিলা মিছিল বের করেন, যা নগরীতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এর আগে তিনি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ২৬ দফা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন। চট্টগ্রাম-৯ আসনে জামায়াত প্রার্থী ডা. এ কে এম ফজলুল হক এবং চট্টগ্রাম-১১ আসনে মোহাম্মদ শফিউল আলমও পৃথকভাবে প্রচারণা চালান।
এনসিপির প্রার্থীদের মধ্যে চট্টগ্রাম-৮ আসনের জোবাইরুল ইসলাম আরিফ নগরীর চান্দগাঁও ও বোয়ালখালী এলাকায় দিনভর পথসভা ও গণসংযোগ করেন। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর শাহজাহান চৌধুরী এবং বিএনপির নাজমুল মোস্তফা আমিন নিজ নিজ এলাকায় বড় আকারের মিছিল ও গণসংযোগ করেন।
বামপন্থী দলগুলোর প্রার্থীরাও শেষদিনে সক্রিয় ছিলেন। সিপিবির মছিউদ্দৌলা ও প্রমোদ বড়ুয়া এবং বাসদ-মার্কসবাদীর প্রার্থীরা ধনী ও পুঁজিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে ভোটারদের সচেতন করার আহ্বান জানান।
এদিকে নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে চট্টগ্রাম মহানগরীতে যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে নগর পুলিশ। সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ট্যাক্সিক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস, ট্রাক ও মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে জরুরি সেবা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, সাংবাদিক ও অনুমোদিত পর্যবেক্ষকদের যানবাহন এ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।
সব মিলিয়ে শেষদিনের প্রচারণায় চট্টগ্রাম ছিল রাজনৈতিকভাবে মুখর। এখন সব পক্ষের দৃষ্টি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের দিকে—সেই সঙ্গে ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হবে কি না, তা নিয়েই নগরবাসীর প্রত্যাশা।
