সংযমের বার্তা নিয়ে রমযান শুরু হলেও সংযম নেই দেশের ভোগ্যপণ্যের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে। রমজানকে ঘিরে চিনি আর ছোলার দাম কেজিতে বেড়েছে ৮-১০ টাকা। একদিনের ব্যবধানে রসুনের দাম বেড়েছে ৩৫ টাকা। কেজিপ্রতি দেশি পেঁয়াজের দাম ৫ টাকা কমলেও খেজুর, ভোজ্যতেল ও ডালের দাম এখনও উর্ধ্বমুখী।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে সময়মতো পণ্য খালাস না হওয়া এবং জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছুটিতে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে তাদের দাবি, বর্তমানে বাজারে পণ্যের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে এবং পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কার্যকর বাজার তদারকির অভাবেই দামের এমন অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, রমজান সামনে রেখে গত সাড়ে সাত মাসে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার ১৭ ধরনের ২৯ লাখ মেট্রিক টন ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে। এরমধ্যে ছোলার আমদানি গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭৭ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে ১ লাখ ৬৬ হাজার ১২৬ মেট্রিক টন ছোলা আমদানি হলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯৫ হাজার ৫৬ মেট্রিক টনে। তবুও বাজারে ছোলার দাম মানভেদে কেজিতে ৪-৮ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাইকারিতে ছোলা ৮৫ টাকায় বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে এর দাম ঠেকেছে ৯৫-১০০ টাকায়।
খাতুনগঞ্জের মেসার্স আল মদিনার মালিক এহসান উল্লাহ জাহেদী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের জটিলতার কারণে সরবরাহ বন্ধ ছিল। সে কারণে ছোলার মানভেদে ৫ থেকে ৬ টাকা দাম বেড়েছে। এখন সরবরাহ শুরু হয়েছে, সামনে দাম সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে চিনির দাম কেজিতে ৮-১০ টাকা বেড়ে ৯৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা খুচরা বাজারে ১০৫-১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ইফতারের প্রধান অনুষঙ্গ খেজুরের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। সরকার খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নিলেও বাজারে এর তেমন ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। বিশেষ করে যেসব খেজুর মূলত নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ক্রেতারা বেশি কেনেন, সেগুলোর মূল্য বেড়েছে। বস্তা খেজুর বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ২২০ টাকায়, জাহিদি খেজুর ২৬০ থেকে ২৮০ টাকায়, দাবাস ৫৫০ থেকে ৫৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য খেজুরের দামও কিছুটা বেড়েছে, যেমন- বড়ই খেজুর ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকায়, কালমি ৭০০ টাকায়, সুক্কারি ৮০০ টাকায়, মাবরুম ৮৫০ থেকে ১২০০ টাকায়, মরিয়ম ১১০০ থেকে ১৪০০ টাকায় এবং মেডজুল ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জের মেসার্স আমেনা ট্রেডার্সের মালিক নুরুল আজিম মুন্না বলেন, নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে খেজুরের বাজার কিছুটা অস্থির ছিল। যে বাজার ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় ছিল, তা বেড়ে ২ হাজার ২০০ থেকে অনেক জায়গায় ২ হাজার ৩০০ টাকায় উঠেছিল। তবে এখন কিছুটা কমে আসছে।
মসলা জাতীয় পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে রসুনের দাম। কেজিপ্রতি ৩৫ টাকা বেড়ে বর্তমানে রসুন ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি পেঁয়াজের দাম দুই দিন আগে ৬০ টাকায় উঠলেও পরে ৫ টাকা কমে ৫৫ টাকায় নেমেছে। বিভিন্ন ধরনের ডালের দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন জানান, বর্তমানে বাজারে ছোলা, মটর ও খেজুরসহ রমজান-সংশ্লিষ্ট পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক ধর্মঘটে অন্তত ৭ দিন সরবরাহ লাইনে সংকট তৈরি হয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই দিনের সরকারি বন্ধ। পরিস্থিতির উন্নতি হয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও দাম নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিক মুনাফার উদ্দেশ্যে সুযোগ বুঝে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। আর রমজান এলেই এ প্রবণতা আরো বেড়ে যায়। এবারও রোজার আগেই প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়িয়েছে ব্যবসায়ীরা।
