চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় ১১ ঘণ্টা সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে যৌথ বাহিনী। আজ সোমবার সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার সদস্য অংশ নেন। অভিযানের মুখে জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকার ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন পালিয়ে গেছেন। তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তবে আটক করা হয়েছে ১৫ জনকে। উদ্ধার করা হয়েছে বেশ কিছু ভারি অস্ত্রশস্ত্র।
পুলিশের দাবি, অভিযানে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছেন তারা। এ ছড়া বিস্তীর্ণ এই এলাকার নিরাপত্তায় র্যাব ও পুলিশের দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হবে।
দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি ও দুর্গম এই অঞ্চলটিতে অপরাধীরা নির্বিঘ্নে আত্মগোপনে থাকছিল এবং অস্ত্র মজুত করে রাখছিল। এ অঞ্চলটি অপরাধী চক্রের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে সুপরিচিত। তাই সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পিতভাবে এই অভিযান শুরু করে যৌথবাহিনী।

অভিযানে বাধা সৃষ্টি :
অভিযান শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় যৌথ বাহিনীকে। কোথাও রাস্তার ওপর বড় ট্রাক রেখে ব্যারিকেড দেওয়া হয়, আবার কোথাও কালভার্ট ভেঙে দেওয়া হয়। একটি স্থানে নালার স্ল্যাব তুলে ফেলা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, অভিযানের খবর আগেই পেয়ে যায় এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যরা। ফলে রবিবার রাতেই তারা এসব প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, এটি অনেক বড় অভিযান। এখানে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য রয়েছে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকার সন্ত্রাসীদের সিএনজি অটোরিকশা চালক থেকে শুরু করে নানা ধরনের সোর্স রয়েছে। এসব সোর্সের মাধ্যমে যেকোনো তথ্য দ্রুত তাদের কাছে পৌঁছে যায়। সম্ভবত সেইভাবেই তারা অভিযানের খবর জেনে গেছে।
তিনি বলেন, ছিন্নমূল ও আলীনগর জঙ্গল সলিমপুরের অংশ। ছিন্নমূল এলাকায় পৌঁছানোর পর আলীনগরে ঢোকার আগে একটি ট্রাক দিয়ে রাস্তা অবরোধ করা হয়। পরে যৌথ বাহিনী সেটি সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করে সামনে এগোয়। কিছু দূর পর একটি কালভার্টও ভেঙে ফেলা হয়েছিল। পরে ইট-বালি দিয়ে সেটি ভরাট করে যানবাহন নিয়ে আলীনগরে প্রবেশ করে বাহিনী।

ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ:
সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকে জঙ্গল সলিমপুর ও আশপাশের পুরো এলাকা কার্যত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। পাহাড়ের নিচের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে ভেতরের সরু পথগুলোতেও সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের সদস্যদের অবস্থান নিতে দেখা গেছে। বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন ও পথচারীদের তল্লাশি করা হচ্ছিল। পাহাড়ের ঢালে ও উঁচু জায়গাগুলোতেও সশস্ত্র সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়।
অভিযানের সময় এলাকায় ছিল থমথমে পরিবেশ। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে স্পষ্ট আতঙ্ক লক্ষ্য করা গেছে। অনেকেই ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে ভেতরে অবস্থান করছিলেন। সাধারণত যেখানে সকাল থেকেই মানুষের চলাচল থাকে, সেই পথঘাটগুলো ছিল প্রায় ফাঁকা। ছোট দোকান ও চায়ের স্টলগুলোর বেশিরভাগই বন্ধ ছিল। পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অভিযানের সময় পুরো এলাকায় ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ ছিল।
একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপের আধিপত্য :
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয়। এর মধ্যে একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অন্য পক্ষের নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন। এছাড়া এখানে মসিউর গ্রুপ ও রিদোয়ান গ্রুপের সদস্যরাও সক্রিয়। এই গ্রুপগুলোর ছত্রছায়ায় চট্টগ্রাম শহরের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও বিভিন্ন মামলার আসামিরা এখানে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছে বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারীরাও এই এলাকায় আশ্রয় নিতে পারে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের মতে, নগরে সম্প্রতি পরিচালিত ‘এস ড্রাইভ’ অভিযানের কারণে অনেক অপরাধী জঙ্গল সলিমপুরে এসে আশ্রয় নিয়েছে।
পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে অবৈধ বসতি:
জঙ্গল সলিমপুর এলাকার আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে অবৈধ বসতি। স্থানীয়দের ভাষ্য, চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে এখানে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার বসতি। এখনো পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য চলছে। এই জমি দখল ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেই বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে ওঠে। এসব বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় সশস্ত্র পাহারা দিয়ে আধিপত্য বজায় রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আগের ঘটনাগুলো :
জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে গত কয়েক বছরে একাধিক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি সেখানে অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন র্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। এর আগে গত বছরের অক্টোবরে দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের সংঘর্ষে একজন নিহত হন। পরদিন সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।
বোরকা পরে ইয়াসিন পলায়ন!:
অভিযানে ১৫ জনকে আটক করা হলেও শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মোহাম্মদ ইয়াসিন পালিয়ে গেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, ভোরের দিকে পাহাড়ি একটি গোপন পথ দিয়ে বোরকা পরা একজনকে দ্রুত এলাকা ছাড়তে দেখা গেছে। এলাকাবাসীর ধারণা, তিনি ইয়াছিন হতে পারেন।
স্থানীয়দের দাবি, অতীতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময় বিভিন্ন ছদ্মবেশে এলাকা ত্যাগ করেছেন তিনি। কখনও নারী বেশে, কখনও সিএনজি চালকের পরিচয়ে তিনি এলাকা ছাড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইয়াসিনের নতুন রাজনৈতিক যোগসূত্র :
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ইয়াসিন অতীতে সীতাকু-ের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আল মামুনের অনুসারী ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি নিজেকে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী বলে দাবি করে আসছেন।
তবে র্যাব কর্মকর্তা নিহত হওয়ার ঘটনার পর গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে আসলাম চৌধুরী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে তার কোনো অনুসারী নেই এবং ওই ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত নয়।
স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ :
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় স্থায়ীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র্যাব ও পুলিশের দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আহসান হাবীব পলাশ বলেন, র্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও এপিবিএনের মোট তিন হাজার দুইশ সদস্য এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন। আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল এই বিশাল এলাকায় প্রশাসনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। আমরা সেটি করতে পেরেছি।
তিনি আরও বলেন, আজ থেকেই এলাকার নিরাপত্তায় পুলিশ ও র্যাবের দুটি ক্যাম্প চালু হবে। ক্যাম্পের নিরাপত্তার প্রয়োজনে এখানে ভারী অস্ত্র মোতায়েন করা হবে।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ডা. জিয়াউদ্দীন বলেন, এখানে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন ছিল। এখন সেটি হয়েছে। সরকার আগে থেকেই এই এলাকা ঘিরে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছিল। এখন আমরা সেই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু করব।
