চট্টগ্রাম নগরীতে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে হামের সংক্রমণ। গ্রামের তুলনায় শহরে এই রোগের প্রকোপ প্রায় ১৮ গুণ বেশি। বিশেষ করে নগরের ঘিঞ্জি ও বস্তি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বসবাসকারী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়।
গতকাল বৃহস্পতিবারও নতুন করে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৭ শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। একই দিনে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও দুই শিশুর মৃত্যুতে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে গত দু’দিনে চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুরাই মূলত হামের প্রধান শিকার। সচেতনতার অভাব এবং টিকাদান কর্মসূচি সম্পর্কে ভুল ধারণার কারণে অনেক শিশুই এখনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মহানগর এলাকায় হামে আক্রান্ত ও সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা উপজেলার তুলনায় প্রায় ১৮ গুণ বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম মহানগরীতে এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৩ জনে। বিপরীতে জেলার ১৫টি উপজেলায় এ সংখ্যা মাত্র ৫ জন। ফলে আক্রান্তদের বিশাল অংশই শহরকেন্দ্রিক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১২ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে, যাদের মধ্যে চারজন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৭ জনকে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া ১২৩ জন হামের লক্ষণযুক্ত রোগীর নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মহানগরীর বাকলিয়া, লালখান বাজার, খুলশী ও চান্দগাঁও এলাকায় সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এসব এলাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত বসতি গড়ে ওঠায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে, শহরের কাছাকাছি অবস্থিত কর্ণফুলী, হাটহাজারী ও বোয়ালখালী উপজেলার কিছু এলাকাতেও সংক্রমণের হার বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব এলাকার মানুষের সঙ্গে নগরের নিয়মিত যাতায়াতের কারণে ভাইরাসটি সহজেই বিস্তার লাভ করছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিস্তারের পেছনে প্রধানত সচেতনতার অভাব, টিকাদান সম্পর্কে ভুল ধারণা এবং ঘনবসতিপূর্ণ জীবনযাপন দায়ী। অনেক অভিভাবক এখনও শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়ার বিষয়ে উদাসীন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (সিআইএমসিএইচ) অধ্যক্ষ ও শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে টিকাদানই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তাই শিশুদের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী টিকা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি জ্বর, ফুসকুড়ি, চোখ লাল হওয়া বা কাশি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান জানান।
চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুই নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় হামের টিকা নেয়নি। সিআইএমসিএইচে গত মার্চ মাসে ভর্তি হওয়া ১০ জন শিশুর কেউই টিকা নেয়নি বলে জানা গেছে।
এদিকে, হামে আক্রান্ত শিশুদের অনেকেই জটিল অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। চিকিৎসকরা জানান, হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠছে। মার্চ মাসে সিআইএমসিএইচে ভর্তি হওয়া ১০ শিশুর মধ্যে ৫ জনকে পিআইসিইউতে রাখতে হয়েছিল।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সাবেক অধ্যাপক ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বাসনা মুহুরি বলেন, হামের চেয়ে এর জটিলতাগুলো শিশুর জীবনের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট প্রাণঘাতী হতে পারে।
চট্টগ্রামে হামের পরীক্ষা করার জন্য নিজস্ব কোনো ল্যাবরেটরি নেই। ফলে সন্দেহভাজন রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ‘ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজেলস ল্যাবরেটরি’ এবং আইপিএইচে এসব নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
সিআইএমসিএইচর অধ্যক্ষ ডা. মুসলিম উদ্দিন সবুজ জানান, স্থানীয়ভাবে পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় লক্ষণের ভিত্তিতেই রোগীদের আইসোলেশন ব্লকে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ১ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে মোট ১২৩টি নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি পজিটিভ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১০ জন মহানগরের এবং ২ জন উপজেলার বাসিন্দা।
চট্টগ্রামের জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, জেলায় হামের টিকার কোনো সংকট নেই। তিনি অভিভাবকদের নির্ধারিত সময়ে শিশুদের টিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি নগরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান সিভিল সার্জন।
