কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় ভূমিদস্যু চক্রের স্বার্থে বাধা দেওয়ায় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই কর্মকর্তা হলেন- মাতামুহুরী তদন্ত কেন্দ্রের এসআই ফারুক হোসেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জমি দখলচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় একটি ভূমিদস্যু চক্র তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকায় বিধবা আরিফা খাতুনের একটি জমি দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল একই এলাকার মো. রফিক ওরফে লেডু। এলাকাবাসীর ভাষ্য, রফিক দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ‘ভূমিদস্যু’ হিসেবে পরিচিত। তবে এসআই ফারুকের কঠোর অবস্থানের কারণে ওই দখলচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর থেকেই তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
ঘটনার নেপথ্য:
ঘটনার সূত্রপাত গত ৩ এপ্রিল। ওই দিন আরিফা খাতুন তার পুরোনো ঘর ভেঙে নতুন ঘর নির্মাণ শুরু করলে রফিক ওই জমির মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করেন। পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে আরিফা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। চকরিয়া থানার নির্দেশে এসআই ফারুক ঘটনাস্থলে গিয়ে উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিরপেক্ষ সার্ভেয়ার দিয়ে জমি পরিমাপ করে বিরোধ নিষ্পত্তির পরামর্শ দেন। কিন্তু রফিক এতে রাজি হননি এবং নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নির্মাণসামগ্রী চুরির ঘটনাও ঘটে।
পরদিন রফিক থানায় অভিযোগ দায়ের করলে পুলিশ উভয় পক্ষকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ থানায় হাজির হতে বলে এবং সাময়িকভাবে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয়। এতে আরিফা খাতুন অসন্তোষ প্রকাশ করে পৃথক অভিযোগ করেন। গত ৭ এপ্রিল পুনরায় ঘটনাস্থলে গেলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশকে হেনস্থার অভিযোগ:
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসেন। সেখানে রফিকের পক্ষের লোকজন পুলিশের ওপর হামলার চেষ্টা করে এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ রফিককে হেফাজতে নেয়। পরে তার পরিবারের সদস্যরা তদন্ত কেন্দ্রে গিয়ে উত্তেজনাকর আচরণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রফিকের অভিযোগ, স্থানীয়দের দাবি ভিত্তিহীন:
এদিকে রফিকের পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগ করা হয়, ঘুষ না পেয়ে এসআই ফারুক এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূকে লাথি মেরে আহত করেছেন। তবে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্য, ঘটনাস্থলে এমন কোনো ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জমি দখলে ব্যর্থ হয়ে এসআই ফারুক হোসেনের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তাদের দাবি, ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব প্রচার চালানো হচ্ছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে ছিলাম। এমন কোনো আঘাতের ঘটনা ঘটেনি। প্রশাসন আইন অনুযায়ী কাজ করেছে। এখন মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করা হচ্ছে।
এমন অভিযোগও সরাসরি অস্বীকার করেছেন এসআই ফারুক। তিনি বলেন, আমাকে ফাঁসানোর জন্য সম্পূর্ণ বানোয়াট অভিযোগ আনা হয়েছে। যদি সত্যিই এমন ঘটনা ঘটত, তাহলে ওই নারী হাসপাতালে ভর্তি থাকতেন। কিন্তু তিনি উল্টো তদন্ত কেন্দ্রে এসে বিশৃঙ্খলা করেছেন।
মাতামুহুরী তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ পরিদর্শক হিমেল হাসানও অভিযোগটি নাকচ করে বলেন, এসআই ফারুক হোসেন কোনো ধরনের মারধর বা অনৈতিক লেনদেনে জড়িত নন। গর্ভবতী নারীকে আঘাত করার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে একটি পক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে।
রফিকের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ মানুষ:
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযুক্ত রফিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত। তার কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, জমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করে মানুষকে হয়রানি করা যেন তার নিত্যদিনের কাজে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রফিকের কারণে আমরা দীর্ঘদিন ধরে শান্তিতে থাকতে পারছি না। তিনি নানা অজুহাতে জমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করেন এবং প্রভাব খাটিয়ে মানুষকে চাপে রাখেন। এতে করে সাধারণ মানুষ সব সময় আতঙ্কে থাকে।
৪ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় ঘর নির্মাণে বাধা:
ভুক্তভোগী আরিফা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, আমার কাছে চার লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে। আমি দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এমনকি আমার নিজস্ব জমিতে ঘর নির্মাণেও বাধা দেওয়া হয়। পুলিশ আমাদের কাগজপত্র যাচাই করে সহযোগিতা করতে এলে তাদেরও হেনস্থা করা হয় রফিকের লোকজনের মাধ্যমে।
তিনি আরও বলেন, এসআই ফারুক সাহেবের দৃঢ় অবস্থানের কারণে রফিক আমার জায়গা দখল করতে পারেনি। তবে এখনো বিভিন্নভাবে আমাকে হয়রানি করা হচ্ছে। আমি শুনেছি, এসআই ফারুকের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে তার সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চলছে। তিনি এখানে থাকলে রফিক কারও জমি অবৈধভাবে দখল করতে পারবে না বলেই তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
আরিফা খাতুন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আমি আকুল আবেদন জানাই, যেন দ্রুত রফিকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে এই হয়রানি থেকে রক্ষা করা হয়।
