চট্টগ্রামের রাজনীতিতে বহুবার আলোচিত সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন। বাংলা নববর্ষের দিনে তার বাসায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর সৌজন্য সাক্ষাৎ ঘিরে নগর রাজনীতিতে নতুন করে জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অবস্থান বদলের ইতিহাস থাকা মনজুর আলম কি নতুন কোনো রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে এগোচ্ছেন— এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে।
উত্থান, দলবদল ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
১৯৯০ সালের ৩১ জুলাই চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন থেকে সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তরের পর নতুন নেতৃত্বের উত্থান ঘটে। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালে চসিকের প্রথম নির্বাচনে উত্তর কাট্টলী ১০ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন মনজুর আলম। আওয়ামী লীগের সমর্থনে টানা তিনবার নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন।
তবে চসিকের চতুর্থ নির্বাচনে এসে বদলে যায় রাজনৈতিক সমীকরণ। দল পরিবর্তন করে বিএনপির টিকিটে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং নগরপিতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার রাজনৈতিক জীবনের এই মোড়ই তাকে ‘কৌশলী’ রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি দেয়।
একই সময়ে তার পারিবারিক পরিমণ্ডলেও দেখা যায় ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান—ভাতিজা দিদারুল আলম আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

নির্বাচন বর্জন থেকে ‘কামব্যাক’ চেষ্টা
২০১৫ সালের সিটি নির্বাচনে বিএনপির সমর্থনে অংশ নিলেও ভোটের দিন কারচুপির অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করেন মনজুর আলম। এরপর এক পর্যায়ে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেও তা স্থায়ী হয়নি।
২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইলেও দল তাকে আর গ্রহণ করেনি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে আবারও রাজনীতিতে সক্রিয়তার জানান দেন।
সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট: নীরবতা ভাঙার ইঙ্গিত?
২০২৪ সালের অস্থির রাজনৈতিক সময়ে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের তার বাসার নিরাপত্তায় অবস্থান নেওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর ২০২৬ সালের নির্বাচন ঘিরে এনসিপির সঙ্গে তার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।
যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচনে অংশ নেননি, তবুও নববর্ষের একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ আবারও তাকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনে। ১৪ এপ্রিল তার বাসায় এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর সফর রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে।
কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা?
মনজুর আলম নিজে এ সাক্ষাৎকে ‘ব্যক্তিগত সৌজন্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, এটি কোনো রাজনৈতিক বৈঠক ছিল না।
তার ছেলে সাইফুল আলম, যিনি নিজেও কাউন্সিলর পদে আগ্রহী, একই সুরে কথা বলেন। তিনি জানান, এখনো তারা কোনো নির্বাচনী সিদ্ধান্ত নেননি।
অন্যদিকে, চসিকের বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন মনজুর আলমের অতীত দলবদল নিয়ে সমালোচনা করেছেন।
এদিকে এনসিপির চট্টগ্রাম তত্ত্বাবধায়ক জোবায়েরুল আরিফ ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে বলেন, মনজুর আলম ভবিষ্যতে দলের প্রার্থী হতে পারেন—আবার নাও হতে পারেন।
বিশ্লেষণ: কৌশল নাকি কাকতালীয়?
মনজুর আলমের রাজনৈতিক অতীত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের অবস্থান নির্ধারণে পারদর্শী। ফলে এই ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ কতটা ব্যক্তিগত আর কতটা রাজনৈতিক—তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
চট্টগ্রামের রাজনীতিতে এখনও তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী নাম। তাই তার যেকোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ নির্বাচনী সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন দেখার বিষয়—এই সাক্ষাৎ কেবল সৌজন্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি এটি নতুন কোনো রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা ঘটায়।
