চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ঢুকতেই ভিড় আর কোলাহলে থমকে যেতে হয়। ওয়ার্ডের এক কোণায় স্থাপিত বিশেষায়িত হাম ইউনিটে দেখা যায় মানবেতর পরিস্থিতি। মাত্র ৩০০ বর্গফুটের একটি কক্ষে দুই সারিতে বসানো আটটি শয্যায় তিন থেকে চারজন করে হাম আক্রান্ত শিশু গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছে। তাদের পাশে বসে আছেন উদ্বিগ্ন মা-বাবা বা স্বজনেরা।
গত মাসে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে শুরু করলে হাসপাতালটিতে এই বিশেষ ইউনিট চালু করা হয়। তবে রোগীর চাপ দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় সীমিত শয্যায় চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গাদাগাদি পরিবেশে চিকিৎসা চলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। একই কক্ষে একাধিক সংক্রামিত শিশুর অবস্থান, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের অভাব এবং পরিচ্ছন্নতার সীমাবদ্ধতা নতুন করে আরও শিশু আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

চমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৬ শয্যার বিশেষ হাম ইউনিটে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জনের বেশি শিশু ভর্তি থাকছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সেখানে ভর্তি ছিল ৪৭ জন শিশু, যার মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় থাকা পাঁচজনকে শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়েছে। প্রতিদিন নতুন করে আরও ১৫ থেকে ২০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছে।
গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, ইউনিটের প্রতিটি বেডই রোগীতে পূর্ণ। কোনো কোনো শিশুর হাতে ক্যানুলা, কারো চলছে অক্সিজেন। হাটহাজারী থেকে আসা আরিশা জাহান তার সাড়ে এগারো মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে চার দিন ধরে এখানে অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, সাত দিন ধরে আমার ছেলে হামে আক্রান্ত। এখানে আনার পর কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবে ভিড়ের কারণে খুব কষ্ট হচ্ছে।
একই চিত্র পাশের শয্যাতেও। সাত মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে থাকা হাসিনা বেগম জানান, প্রথমে তারা এটিকে এলার্জি ভেবেছিলেন। স্থানীয় এক চিকিৎসকও সে অনুযায়ী ওষুধ দেন। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে তিন দিন আগে শিশুটিকে এখানে ভর্তি করা হয়।
অভিভাবকদের অভিযোগ, এক শয্যায় একাধিক শিশু থাকায় বুকের দুধ খাওয়ানো, ওষুধ দেওয়া কিংবা স্বাভাবিক পরিচর্যার মতো ন্যূনতম সুযোগও পাওয়া যাচ্ছে না।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও শয্যা সংকটের বিষয়টি স্বীকার করছে। শিশু ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সীমিত শয্যায় একাধিক শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে হামের লক্ষণ নিয়ে দুই শতাধিক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ৪১৩ শিশুর নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ৩৭ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অনেক শিশু টিকা নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। টিকাদান কার্যক্রম জোরদারে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে।
এদিকে, চিকিৎসার ব্যয় বহন করাও অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। নি¤œ ও স্বল্প আয়ের অভিভাবকদের অনেকেই জানিয়েছেন, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে তারা আর্থিক সংকটে পড়ছেন। অনেকে ধারদেনা করে সন্তানের চিকিৎসার খরচ মেটাচ্ছেন।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, রোগীর চাপ বেড়েছে ঠিকই, তবে আমরা সিরিঞ্জ, অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত শয্যা বাড়ানোর বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
