back to top

রাউজানে ২১ মাসে ২৩ হত্যাকাণ্ড, বিএনপিরই খুন ১৩

খুনিরা অধরা, উদ্ধার হয় না আগ্নেয়াস্ত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ ০৬:০৭
[photo_card_and_fontsize]

চট্টগ্রামের রাউজানে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটেই চলছে। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ২১ মাসে উপজেলাটিতে অন্তত ২৩ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে ১৩ জন সরাসরি বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডই ঘটেছে প্রকাশ্যে গুলি করে। তবে এসব ঘটনায় জড়িতদের বেশির ভাগ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। সর্বশেষ গত রবিবার রাতে নাছির উদ্দীন (৪৫) নামে এক যুবদল কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগের দিন শনিবার ভোরে রাউজান পৌরসভার আইলীখীল গ্রামে মুহাম্মদ কাউসার উজ জামান বাবলু (৩৬) নামে এক বিএনপি কর্মীকে হত্যা করে সন্ত্রাসী।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মো. সিরাজুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, রাউজানে হত্যাকা-গুলোর বেশির ভাগই স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার ও ব্যবাসায়িক গ্রুপিং দ্বন্দ্বের জেরে ঘটছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে। ইতিমধ্যে গত দুই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

স্থানীয় সূত্র জানায়, একসময় সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত রাউজানে দীর্ঘ সময় নিয়ন্ত্রণ ছিল আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর হাতে। ওই সময়ে বর্তমান রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বিদেশে অবস্থান করছিলেন এবং দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী এলাকা ছাড়া ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। বিএনপির নেতারা এলাকায় ফিরে আসেন এবং আওয়ামী লীগ-শূন্য রাউজানে শুরু হয় নতুন করে ক্ষমতার লড়াই। সেই সঙ্গে দেখা দেয় দলীয় কোন্দল। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট প্রথম খুনের ঘটনা ঘটে। পরবর্তী ২১ মাসে অন্তত ২৩ জন নিহত হন। একই সময়ে বহু ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।

একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনীর দাপট

স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, বর্তমানে রাউজানে একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী সক্রিয়। এসব বাহিনী এলাকা ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ করছে। মাদক, বালু ও মাটির ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে তারা বিপুল অর্থ উপার্জন করছে। এক বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অন্য বাহিনীর হস্তক্ষেপ হলেই শুরু হচ্ছে সংঘর্ষ, যা অনেক ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডে গড়াচ্ছে। তবে বর্তমানে শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান গ্রুপ ও জানে আলম গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ বেড়েছে। সর্বশেষ নিহত যুবদল কর্মী নাছির উদ্দীনকে স্থানীয়ভাবে রায়হান গ্রুপের সদস্য হিসেবে পরিচিত। নাছিরের বিরুদ্ধে এক বিএনপি কর্মী খুনসহ ৬টি মামলা আছে। সন্ত্রাসী রায়হান পুরো চট্টগ্রামের আতঙ্কের নাম। রাউজানে বেশিরভাগ খুনের ঘটনায় তার নাম এসেছে। রায়হান শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের প্রধান সহযোগী। তার বিরুদ্ধে গত বছরের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় জোড়া খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি হত্যা মামলা।

সন্ত্রাসীরা দুই নেতার বলয়ে বিভক্ত

রাউজানে বিএনপির রাজনীতিও বর্তমানে দুই ভাগে বিভক্ত। এক অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, অপর অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা গোলাম আকবর খোন্দকার। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই দুই পক্ষের অনুসারীদের মধ্যে প্রায় সব ইউনিয়ন ও পৌরসভায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়দের দাবি, আগে আওয়ামী লীগের আশ্রয়ে থাকা অনেক সন্ত্রাসী এখন দলীয় খোলস বদলে বিএনপির অনুসারী হিসেবে সক্রিয় হয়েছে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশে-বিদেশে থাকা পুরোনো সন্ত্রাসীরাও। ফলে প্রতিটি এলাকায় একাধিক গ্রুপ তৈরি হয়ে অরাজকতা বাড়াচ্ছে।

নিহত ১৩ বিএনপির কর্মী

৫ আগস্টের পর রাউজানে নিহত বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে রয়েছেন- নাছির উদ্দীন, কাউসার উজ জামান বাবলু, মুজিবুর রহমান, সাইফুদ্দিন (রিয়াদ), জানে আলম, আলমগীর (ডাকাত আলম), আবদুল হাকিম, সেলিম, আলমগীর, ইব্রাহিম, কমর উদ্দিন জিতু, আবদুল্লাহ মানিক ও দিদারুল আলম রিংকু। এ ছাড়া রাউজানে আওয়ামী লীগের পাঁচজন কর্মীও নিহত হয়েছেন। এরা হলেন- আবদুল মান্নান, মুহাম্মদ ইউসুফ মিয়া, আবু তাহের ও মুহাম্মদ হাসান।

খুনিরা অধরা, উদ্ধার হয় না আগ্নেয়াস্ত্র

রাউজান প্রতিটি হত্যাকা-েই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়েছে। অধিকাংশ ঘটনাই প্রকাশ্যে গুলি করে সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দিবালোকেই সশস্ত্র হামলার দৃশ্য দেখা যায়। ফলে সহিংসতার বিষয়টি আর গোপন থাকছে না; বরং প্রকাশ্য বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এত দৃশ্যমান প্রমাণ থাকার পরও জড়িতদের গ্রেপ্তারে কার্যকর অগ্রগতি নেই। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সিরাজুল ইসলাম বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। রাউজানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশি টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে যেকোনো তথ্য পুলিশকে জানাতে অনুরোধ করেন তিনি।