back to top

ফ্লাইওভারে ছাত্রলীগ নেতার ঝুলন্ত মরদেহ, আত্মহত্যাই বলছে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৩ মে, ২০২৬ ১১:৪৪
[photo_card_and_fontsize]

চট্টগ্রাম নগরের সাগরিকা ফ্লাইওভারে যুবক কাউসার হামিদের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে আত্মহত্যা বলছে পুলিশ। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং আলামত বিশ্লেষণ করে তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যার কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি এবং পরিবারের নীরবতায় ঘটনাটি ঘিরে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

নিহত কাউসার হামিদ প্রকাশ আবু কাউছার নগরের পশ্চিম ফিরোজ শাহ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি বিএসআরএম কারখানায় খণ্ডকালীন পাহারাদার হিসেবে কাজ করতেন। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার উরকিরচর এলাকায়।

পুলিশ জানায়, গত সোমবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে পাহাড়তলী থানার সাগরিকা এলাকায় উড়ালসড়কের নিচ থেকে কাউসারের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউসারকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের আকবর শাহ থানার ‘মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক’ দাবি করে বিভিন্ন পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। কিছু পোস্টে ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলেও উল্লেখ করা হয়। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

কাউসার হামিদ

পুলিশের দাবি আত্মহত্যা

পুলিশের দাবি, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, আলামত এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আত্মহত্যার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১টা ১৬ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে কাউসার একাই ফ্লাইওভারে ওঠেন। পরে তাকে রেলিংয়ের কাছে দেখা যায়। কিছু সময় পর তিনি রশি বেঁধে নিচে ঝুলে পড়েন। ঘটনাস্থলে সংঘর্ষ, টেনে নেওয়া কিংবা হত্যার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

পাহাড়তলী থানার ওসি মুহাম্মদ নুরুল আবছার বলেন, ঘটনাস্থলের আলামত, গলার দড়ির দাগ, লাশের অবস্থান এবং ফ্লাইওভারের কাঠামো বিশ্লেষণ করেও হত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুকে ‘অস্বাভাবিক’ বলে দাবি করলেও তারা কোনো হত্যা মামলা করেননি। পুলিশের অভিযোগ, প্রথমদিকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দ্রুত নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে পুলিশের অনুরোধে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, গলার দড়ির দাগের প্রকৃতি, দেহের অবস্থান এবং ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি; সবকিছুই আত্মহত্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোনো তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত মেলেনি।

রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউসারের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। তাকে ছাত্রলীগের আকবর শাহ থানার ‘মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পুলিশ বলছে, এটি একই নামের অন্য একজনের সঙ্গে বিভ্রান্তি।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার আলমগীর হোসাইন বলেন, নিহত কাউসারের কোনো সক্রিয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়নি। ছাত্রলীগের আকবর শাহ থানার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে যার নাম বলা হচ্ছে, তিনি ভিন্ন ব্যক্তি। একই নাম হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তাদের দাবি, কাউসার একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। যদিও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ থেকে তিনি রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান।

কাউসারের বাসার সামনে কুলিং কর্ণার দোকাদার শহীদ পারভেজ বলেন, কাউসার আগে ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন। তবে অনেকদিন ধরে সক্রিয় ছিলেন না। এলাকায় নিয়মিত চলাফেরা করতেন। এখন কেউ বলছে হত্যা, কেউ বলছে আত্মহত্যা- আমরা নিশ্চিত না আসলে কী হয়েছে।

৬ মামলার আসামি কাউসার

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাউসারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দস্যুতাসহ ছয়টি মামলা রয়েছে, যেগুলো গত বছরের ৫ আগস্টের আগেই দায়ের করা হয়েছিল। সর্বশেষ মামলা হয়েছিল ২০২৩ সালের শেষের দিকে। ৫ আগস্টের পর তার নামে কোনো মামলা ছিল না। তবে গত দুই বছরে তার আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় মানসিক অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়েন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

প্রতিবেশীদের ভাষ্য, পরিবারে অশান্তি ছিল। বিশেষ করে বড় ভাইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। তবে এ নিয়ে কখনো বড় ধরনের হানাহানির ঘটনা এলাকায় দেখা যায়নি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পারিবারিক কলহ, আর্থিক চাপ এবং ব্যক্তিগত হতাশা—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এসব কারণ মিলেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে কাউসারকে কিছুটা চুপচাপ ও চিন্তাগ্রস্ত দেখা যেত। কাজ করলেও আগের মতো স্বাভাবিক ছিলেন না। এসব বিষয়ও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

কাউসারের বাসায় তালা ঝুলছে

বাসায় তালা, গ্রামে পরিবার

মঙ্গলবার ময়নাতদন্ত শেষে কাউসারের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একই দিন সন্ধ্যায় পশ্চিম ফিরোজ শাহ এলাকায় জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়। আজ বুধবার সকালে সরেজমিনে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তার বাসার দরজায় তালা ঝুলছে। প্রতিবেশীরা জানান, দাফনের পরই তার মা ও দুই ভাই রাউজানের গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন।

পশ্চিম ফিরোজ শাহ এলাকার পোস্ট অফিসসংলগ্ন একটি পুরোনো ভবনের তৃতীয় তলায় পরিবার নিয়ে থাকতেন কাউসার। সেখানে গিয়ে পরিবারের খোঁজ জানতে চাইলে স্থানীয়দের মধ্যে জটলা তৈরি হয়।

রাশেদা আক্তার নামে এক প্রতিবেশী বলেন, ঘটনার পর পরিবার খুব ভেঙে পড়েছে। তারা গ্রামে চলে গেছে।

এদিকে, ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া তথ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পুলিশ। তাদের মতে, যাচাই-বাছাই ছাড়া নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের বিভিন্ন পেইজ থেকে গুজব ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।

পুলিশ বলছে, যেসব পোস্টে কাউসারকে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে উল্লেখ করে হত্যার দাবি করা হয়েছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

উপ-পুলিশ কমিশনার আলমগীর হোসাইন বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং আলামত বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছি কাউসার আত্মহত্যা করেছে।