চট্টগ্রামের টাইগারপাস ফ্লাইওভারের নিচে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গ্রাফিতি অপসারণ নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বন্দরনগরীর রাজনীতি। সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকার মধ্যেই সোমবার সেখানে নতুন করে গ্রাফিতি আঁকার চেষ্টা করলে পুলিশ ও একদল তরুণ-তরুণীর মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন নিজেদের ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ও ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় দেওয়া অংশগ্রহণকারীরা। আহতদের মধ্যে চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীও রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে গ্রাফিতি অঙ্কনে পুলিশি হামলার অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল সোমবার রাত আটটা থেকে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন স্থানে গ্রাফিতি অঙ্কনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। পাশাপাশি মঙ্গলবার দিনব্যাপীও নগরজুড়ে একই কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানিয়েছে দলটি। এরপরই এক সংবাদ সম্মেলনে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, গ্রাফিতি অঙ্কনে কোনো বাধা নেই। মূলত সামনে সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে উত্তজনা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে একটি মহল।
টাইগারপাসে দুই পক্ষের ধস্তাধস্তি
গতকাল সোমবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে টাইগারপাস এলাকায় শহীদ ওয়াসিম আকরাম এক্সপ্রেসওয়ের পিলারে গ্রাফিতি আঁকার জন্য জড়ো হন একদল তরুণ-তরুণী। তারা নিজেদের ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ও ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় দেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, তাদের হাতে ছিল রঙের কৌটা, তুলি ও বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত ব্যানার। পুলিশ তাদের বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রথমে বাক্বিতণ্ডা শুরু হয়। পরে তা ধাক্কাধাক্কি ও ধস্তাধস্তিতে রূপ নেয়। একপর্যায়ে রঙের কৌটা নিয়েও টানাহেঁচড়ার ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশ সদস্য ও আন্দোলনকারীদের গায়ে রং ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে আটক করে। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। জুলাই যোদ্ধা দাবি করা কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, পুলিশের হামলায় তাদের অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারীও রয়েছেন। আহতদের কয়েকজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে হয়েছে বলে তারা জানান।
তরুণীদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা তাদের ওপর চড়াও হন, হাত তোলা হয় নারী শিক্ষার্থীদের ওপর। পরে তারা পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অভিযোগ দেন।

পুলিশের বক্তব্য
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ। উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, টাইগারপাস এলাকায় মেট্রোপলিটন অধ্যাদেশের ৩০ ধারা জারি ছিল। তা অমান্য করে সাধারণ শিক্ষার্থী পরিচয়ে ৫০ থেকে ৬০ জন জড়ো হয়েছিল। তাদের সরে যেতে বলা হলেও তারা যায়নি। সরিয়ে দিতে গেলে পুলিশের গায়ে রং মারে। পরে কয়েকজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল, তবে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সোমবার সকালে জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত সড়ক ও আশপাশ এলাকায় সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)। পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলীর সই করা ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই টাইগারপাস এলাকায় জড়ো হন আন্দোলনকারীরা। পুলিশ দাবি করেছে, সাধারণ শিক্ষার্থীর পরিচয়ে অংশ নেওয়া অনেকেই এনসিপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

গ্রাফিতি ঘিরে বিতর্ক
টাইগারপাস ফ্লাইওভারের নিচে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিবাহী কিছু গ্রাফিতি ছিল। সম্প্রতি সেগুলোর ওপর নতুন করে রং করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এনসিপির নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেন, ইচ্ছাকৃতভাবে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি মুছে ফেলা হয়েছে।
এর আগে রবিবার সন্ধ্যায় একই এলাকায় ‘জুলাই গ্রাফিতি অঙ্কন’ কর্মসূচি পালন করেন এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগর শাখার নেতাকর্মীরা। তারা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার অভিযোগ আনেন এবং চসিক মেয়র ও নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনের সমালোচনা করেন। রবিবার রাতে চসিক কার্যালয়ের সামনে এনসিপির নেতা-কর্মীরা অবস্থান নিলে বিএনপির নেতা-কর্মীরাও পাল্টা অবস্থান নেন। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

বিজ্ঞাপনের জন্য জুলাই গ্রাফিতি মুছে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি এনসিপির
ঘটনার পর গতকাল সোমবার বিকেল ৪ টায় নগরীর ষোলশহরে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেয় এনসিপি। দলটির নেতারা জানান, সোমবার রাত আটটা থেকে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন স্থানে গ্রাফিতি আঁকার কর্মসূচি শুরু হবে। পাশাপাশি মঙ্গলবার দিনব্যাপীও নগরজুড়ে একই কর্মসূচি পালন করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে নগর এনসিপির সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, টাইগারপাসে এনসিপির কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল না। জুলাই আন্দোলনের পক্ষে থাকা শিক্ষার্থীরা গ্রাফিতি আঁকতে গিয়েছিলেন। পুলিশের বাধায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, টাইগারপাস ফ্লাইওভারের নিচে থাকা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গ্রাফিতিগুলো ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপনের জন্য মুছে ফেলা হয়েছে। তবে সমালোচনার মুখে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন পরে দাবি করেন, নতুন করে গ্রাফিতি আঁকার উদ্দেশ্যেই সেগুলো সরানো হয়েছে। আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি মুছে ফেলার যে চেষ্টা চলছে, তার প্রতিবাদে নগরজুড়ে গ্রাফিতি অঙ্কনের কর্মসূচি পালন করা হবে।

সিটি নির্বাচন ঘিরে পরিকল্পিত উত্তেজনা তৈরি করা হচ্ছে বলে দাবি মেয়রের
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, আসন্ন সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি মহল পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে এবং বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
গতকাল সন্ধ্যায় নগর ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অংশ হিসেবে পিলারগুলোতে রং করা হয়েছিল। সিটি করপোরেশন বা আমার ব্যক্তিগত অর্থায়নে নতুন করে গ্রাফিতি করে দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, সামনে সিটি নির্বাচন। মূলত একটি গোষ্ঠী বিষয়টি আমার ওপর চাপিয়ে দিয়ে নোংরা রাজনীতি করতে চাচ্ছে।
মেয়র জানান, জনশৃঙ্খলা রক্ষায় জারি করা ৩২ ধারা তুলে নিতে পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রাফিতি অঙ্কনে কোনো বাধা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সোমবার সন্ধ্যায় তিনি নিজেই গ্রাফিতি অঙ্কনের উদ্বোধন করবেন।
