মুহুরীর বিস্তীর্ণ জলরাশিতে যখন ভোরের আলো পড়ে, তখন একসঙ্গে দেখা যায় মাছের ঘের, শ্রমিকের ব্যস্ততা আর দূরের নদীর স্রোত। সেই স্রোতের মতোই এগিয়ে চলেছেন আজিম উদ্দিন—এক একর থেকে প্রায় এক হাজার একরের পথে। তার গল্প তাই শুধু একজন মৎস্য চাষির সফলতার গল্প নয়; এটি সম্ভাবনাময় এক মৎস্যভূমির সঙ্গে একজন উদ্যোক্তার বেড়ে ওঠার গল্প।
ফেনী নদীর মোহনায় জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চর। একসময় যেখানে ছিল কেবল জল, কাদা আর অনাবাদি জমি, সময়ের পরিক্রমায় সেই চরই হয়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য উৎপাদন অঞ্চল। মিরসরাইয়ের মুহুরী প্রজেক্টের বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে এখন হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান, শত শত মৎস্য প্রকল্প আর প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন বাজারে যাচ্ছে টনকে টন মাছ।
এই সম্ভাবনার জনপদে নিজের স্বপ্ন ও শ্রম দিয়ে আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন ধুম ইউনিয়নের গোলকের হাট এলাকার মৎস্য উদ্যোক্তা আজিম উদ্দিন। মাত্র এক একর জমি দিয়ে শুরু করা সেই তরুণ উদ্যোক্তার মাছ চাষের পরিধি এখন প্রায় এক হাজার একর। জাতীয় মৎস্য পক্ষ -২০২৬ উপলক্ষে মিরসরাই উপজেলার শ্রেষ্ঠ মৎস্য চাষি হিসেবে সম্মাননা পাওয়ার মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘ সংগ্রাম ও সাফল্য পেল আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
জাতীয় মৎস্য পক্ষ -২০২৬-এর তিনদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী দিন ১৬ আগস্ট অনুষ্ঠানটি ছিলো নানা আয়োজনে সাজানো। মৎস্য খাতে বিশেষ অবদানের জন্য এ বছর শ্রেষ্ঠ মৎস্য চাষির পুরস্কার লাভ করেন ধুম ইউনিয়নের আজিম উদ্দিন।
তিন দিনব্যাপী কর্মসূচির প্রথম দিনেই এই সম্মাননা পান তিনি। আজ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয়দিন। আগামীকাল সমাপনী দিনে থাকছে সাঁতার প্রতিযোগীতা ও পুরস্কার বিতরণ।
আজিম উদ্দিন২০১০ সালে মাত্র এক একর দিয়ে শুরু করা একজন চাষির জন্য এই পুরস্কার শুধু একটি সম্মাননা নয়; এটি দীর্ঘ ১৬ বছরের সংগ্রামের স্বীকৃতি। আর আজিম উদ্দিনের কাছে সফলতার অর্থ শুধু নিজের আয় বাড়ানো নয়—তার স্বপ্ন আরও বড়।
তার ভাষায়, “চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। যুবকরা উদ্যোক্তা হলে দেশ স্বনির্ভর হবে, অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং পরনির্ভরশীলতা কমবে। দেশের প্রতিটি মানুষের কর্মশক্তিকে কাজে লাগাতে পারলেই বেকারত্ব কমবে।”
চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিল আজিম উদ্দিনের। ২০১০ সালে ফেনী নদীর মুহুরী চরে মাত্র এক একর প্রকল্প নিয়ে শুরু করেন মাছ চাষ। শুরুর দিকে অভিজ্ঞতা কম থাকায় নানা ভুল-ত্রুটির মধ্য দিয়ে শিখতে হয়েছে। অভিজ্ঞ চাষিদের কাছ থেকে আধুনিক পদ্ধতি, মাছের খাবার ব্যবস্থাপনা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, পানি ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান নেন।
লাভ-লোকসানের হিসাবের পাশাপাশি মাছের সঙ্গে গড়ে ওঠে তার এক ধরনের ভালোবাসা। ধীরে ধীরে ছোট প্রকল্প বড় হতে থাকে। একসময় মাছ চাষ শুধু জীবিকা নয়, হয়ে ওঠে তার ব্যবসায়িক দর্শন ও কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যম।
বর্তমানে তার প্রায় এক হাজার একর মৎস্য প্রকল্পে বিভিন্ন পর্যায়ে ৬ শতাধিক শ্রমিক ও কর্মচারী কাজ করছেন বলে জানান আজিম উদ্দিন। কেউ দৈনিক, কেউ মাসিক, আবার কেউ দিন-রাত পালাক্রমে এসব প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত।
আজিম উদ্দিন বলেন, “আমি ২০১০ সালে মাত্র এক একর জমি দিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছি। আমার লক্ষ্য ছিল চাকরি নয়, উদ্যোক্তা হবো এবং অন্যদের চাকরি দেবো। এখন আমার প্রকল্পে শত শত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।”
মাছ চাষে সাফল্যের পাশাপাশি বড় বড় বিপর্যয়ও দেখেছেন আজিম উদ্দিন। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যা তার জীবনের অন্যতম কঠিন সময়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় প্রায় ৩৫০ একর মৎস্য প্রকল্পের প্রায় ৩০ কোটি টাকার মাছ সাগরের স্রোতে ভেসে যায়।
হঠাৎ বিপুল ক্ষতি, ব্যাংক ঋণের চাপ আর নতুন করে প্রকল্প দাঁড় করানোর কঠিন বাস্তবতা—সবকিছু মিলিয়ে অনেকেই হয়তো থেমে যেতেন। কিন্তু আজিম উদ্দিন থামেননি। নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম শুরু করেন। পরিশ্রম, অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিনির্ভর চাষের মাধ্যমে আবারও প্রকল্পগুলো সচল করেন।
তার মতে, মৎস্য চাষে সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে ধৈর্য। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে উৎপাদন ধরে রাখতে হলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জানতে হবে।
মিরসরাইয়ের মুহুরী প্রজেক্ট শুধু একটি মৎস্য চাষ এলাকা নয়; এটি উত্তর চট্টগ্রামের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে মুহুরী প্রজেক্টে প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার একর জমিতে মাছ চাষ এবং বছরে প্রায় ৪২ হাজার থেকে ৪৯ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদনের তথ্য উঠে এসেছে। ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনে মৌসুমভেদে প্রায় ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকার মাছ বিক্রির তথ্যও প্রকাশিত হয়।
চাষিদের তথ্য মতে, মুহুরী প্রজেক্ট থেকে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ মেট্রিক টনের বেশি মাছ দেশের বিভিন্ন বাজারে যায়।
পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া, কার্প, পাবদা, গুলশা, শিং, কই, মাগুরসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এখানে চাষ করা হয়। উৎপাদিত মাছ মিরসরাইয়ের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
আজিম উদ্দিন জানান, মিরসরাইয়ের প্রায় সাত হাজার একর ঘেরে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ হয়।
এ বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারও বিভিন্ন পর্যায়ে রাজস্ব পেয়ে থাকে। ফলে চাষিদের ভাষায় ‘শত কোটি টাকার রাজস্ব’ অবদান তাদের।
আজিম উদ্দিনের মতে, মুহুরী চরের মাছের চাহিদা শুধু মিরসরাইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফটিকছড়ি, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে এখানকার মাছ যায়। কিছু মাছ বিদেশেও যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
“ মাছের স্বাদ ভালো হওয়ায় বাজারে চাহিদাও বেশি,” বলেন আজিম উদ্দিন।
মৎস্য খাতের এই বিস্তারকে কেন্দ্র করে মিরসরাইয়ে বদলে গেছে অনেক পরিবারের জীবন। কেউ জমির মালিক, কেউ প্রকল্পের শ্রমিক, কেউ মাছের খাবার ব্যবসায়ী, কেউ পরিবহন মালিক, কেউ পরিবহন শ্রমিক, আবার কেউ মাছের পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ একটি মাছের ঘেরকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক হাব।
আজিম উদ্দিনের তথ্য মতো, মুহুরী চরের সম্ভাবনা যত বড়, সংকটও ততটাই বাস্তব। বন্যা, অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, ঘেরের পাড় ভেঙে মাছ বেরিয়ে যাওয়া, পানির তাপমাত্রা বেড়ে মাছ মারা যাওয়া এবং মাছের খাবারের মূল্যবৃদ্ধি—সবকিছুই চাষিদের জন্য বড় ঝুঁকি।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে টানা বৃষ্টিতে মিরসরাইয়ের বঙ্গোপসাগর উপকূলের সাত হাজারের বেশি মাছের ঘের ক্ষতির মুখে পড়ে। তখন প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কার কথা জানাগেছে।
এর আগেও তাপপ্রবাহে মুহুরী প্রকল্পের ঘেরে মাছ মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আজিম উদ্দিন জানান, অনেক জলাশয়ের গভীরতা কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও পানির সংকটে মাছের ঝুঁকি বাড়ে।
মাছের খাদ্যের দাম বাড়লেও বাজারে সে অনুযায়ী দাম না পাওয়ার সমস্যাও রয়েছে। রোগ নির্ণয়ের জন্য স্থানীয়ভাবে পরীক্ষাগার না থাকা আরেকটি বড় সমস্যা। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে মৎস্য চাষিরা উপজেলা পর্যায়ে ল্যাব স্থাপনের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু আজও বাস্তবায়ন হয়নি। আজিম উদ্দিন সংসদ সদস্য নুরুল আমিন এমপির সহায়তা কামনা করেন।
আজিম উদ্দিনের তিন দাবি:-
আজিম উদ্দিন মনে করেন, মুহুরী প্রজেক্টকে শুধু মাছ চাষের এলাকা হিসেবে দেখলে হবে না; এটিকে পরিকল্পিত মৎস্য অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে সরকারি ভাবে ঘোষণা দিতে হবে ।
মৎস্য রোগ নির্ণয়ের জন্য আধুনিক ল্যাব স্থাপন, চাষিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা। একই সঙ্গে ঘের রক্ষায় টেকসই বাঁধ ও পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি মনে করেন “সরকারি সহযোগিতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ পেলে ছোট চাষিরাও বড় উদ্যোক্তা হতে পারবেন। অনেক নতুন চাষি আমার পরামর্শ নিয়ে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। কেউ উদ্যোক্তা হতে চাইলে আমি আমার অভিজ্ঞতা দিয়ে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত,” বলেন তিনি।
