চট্টগ্রাম শহরের ব্যস্ত নাগরিক জীবনের মাঝেও মিরসরাই যেন একটি আলাদা পরিচয় বহন করে। কর্ম, শিক্ষা কিংবা ব্যবসার প্রয়োজনে চট্টগ্রাম নগরীতে বসতি গড়া মিরসরাইয়ের মানুষের কাছে নিজ এলাকার টান অমলিন। সেই টানকে সাংগঠনিক বন্ধনে রূপ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে মিরসরাই এসোসিয়েশন চট্টগ্রাম। সময়ের সঙ্গে সংগঠনটি শুধু মিরসরাইবাসীর পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতির প্ল্যাটফর্মই নয়, শিক্ষা, মানবিক সহায়তা, মেধা বিকাশ ও সামাজিক কল্যাণের নানা উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) নগরীর জিইসি কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত সংগঠনটির বার্ষিক পুনর্মিলনী ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠান-২০২৬ যেন সেই দীর্ঘ পথচলারই এক বর্ণিল প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল। মিরসরাইয়ের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, সংগঠনের সদস্য এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ব্যাপক অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় এক প্রাণের মিলনমেলায়। মিরসরাইয়ের মানুষের বন্ধন মিরসরাই এসোসিয়েশন চট্টগ্রাম। মূলত চট্টগ্রাম নগরীতে বসবাসরত ও বিভিন্ন পেশায় যুক্ত মিরসরাইয়ের মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ, সৌহার্দ্য ও সহযোগিতার একটি সামাজিক প্ল্যাটফর্ম এই সংগঠন । সংগঠনের নিজস্ব কার্যক্রম ছাড়াও দেখা যায়, পুনর্মিলনী এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির পাশাপাশি শিক্ষা ও মানবিক কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়ে মেধাবৃত্তি, গুণীজন সংবর্ধনা, আত্মকর্মসংস্থান সহায়তা ও বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ড। যা সারা বছর ধরে পরিচালিত হয়।
চট্টগ্রামের হালিশহরে সংগঠনের নিজস্ব কার্যালয়কে ঘিরে দেখা যায় মিরসরাই ভাবন যেন শহরের মাঝে মিরসরাইয়ের একটি হৃদপিণ্ড। মিরসরাই এসোসিয়েশন চট্টগ্রাম মেধার বিকাশে মিরসরাইয়ের শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে মেধাবৃত্তি কার্যক্রম সংগঠনটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। ২০২৩ সালে মিরসরাই উপজেলার ৩৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী সংগঠনের মেধাবৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর পাশাপাশি গুণীজন সংবর্ধনা ও শিক্ষাবিষয়ক কার্যক্রমও সংগঠনের উল্লেখযোগ্য কাজ ।
এই সংগঠনের কর্মকাণ্ড শুধু সদস্যদের মিলনমেলা ও বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মিরসরাইয়ের নতুন প্রজন্মের মেধা ও সম্ভাবনাকে উৎসাহিত করার বিষয়টিও এর কার্যক্রমে গুরুত্ব পেয়েছে।
বিপদে মানুষের পাশে:-
সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেও মিরসরাই এসোসিয়েশন চট্টগ্রামের বিভিন্ন উদ্যোগের নজির রয়েছে। ২০২৫ সালে কালবৈশাখী ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও দুস্থ ১০টি পরিবারের ঘর নির্মাণে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন ইউনিয়নের পরিবারগুলোকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সংযোগ :-
পুনর্মিলনী ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠান “মিরসরাই এসোসিয়েশনের অন্যতম আকর্ষণীয় আয়োজন। এতে পুরোনো বন্ধু, সহপাঠী, আত্মীয়, বিভিন্ন পেশার মানুষ এবং নতুন প্রজন্মের সদস্যরা একই ছাদের নিচে মিলিত হওয়ার সুযোগ পান।
এবারের আয়োজন ছিল মিরসরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রামের মেজবান। পাশাপাশি ক্লোজআপ ওয়ানখ্যাত শিল্পীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ফলে সামাজিক যোগাযোগ, ঐতিহ্য ও বিনোদনের সমন্বয়ে আয়োজনটি হয়ে ওঠে সব বয়সী মানুষের মিলনমেলা।
‘বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মিরসরাইয়ের জন্য কাজ করার অঙ্গীকার” :-
এবারের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য নুরুল আমিন মিরসরাই এসোসিয়েশনকে মিরসরাইবাসীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে দল-মত ও রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে এলাকার মানুষের কল্যাণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও মানবিক কর্মকাণ্ডে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে পারলে মিরসরাইকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
বিশেষ অতিথি সংসদ সদস্য শামসুন্নাহার বেগমও সংগঠনের বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন। ভবিষ্যতে মিরসরাইবাসীর কল্যাণে সংগঠনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে বলে আশাবাদ জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মিরসরাই এসোসিয়েশন চট্টগ্রামের সভাপতি মাহফুজুল হক মনি। আহ্বায়ক ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার খায়রুল মোস্তফা। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ উদ দৌজা ও সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার হামিদুল হক।
এক মাসের শ্রম, এক দিনের আনন্দ:-
আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার খায়রুল মোস্তফার কাছে এবারের পুনর্মিলনী ছিল দায়িত্ব ও আবেগের এক বিশেষ অভিজ্ঞতা।
তিনি বলেন, আজকের আনন্দঘন মুহূর্ত মিরসরাইবাসীর জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আয়োজক কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পাওয়ার পর গত এক মাস তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন। অনুষ্ঠানে সদস্যদের উচ্ছ্বাস, আনন্দ ও মিলনমেলা তাঁর সেই পরিশ্রমকে সার্থক করেছে।
আয়োজন সফল করতে সংসদ সদস্য নুরুল আমিন, এসোসিয়েশনের দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং সব সদস্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, সবার সম্মিলিত সহযোগিতাই ছিল সফলতার মূল শক্তি।
সামনে আরও বড় স্বপ্ন:-
একটি এলাকার মানুষ যখন নিজ এলাকার বাইরে থেকেও নিজেদের শেকড়কে আঁকড়ে ধরে, তখন সেই বন্ধন কেবল আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সামাজিক শক্তিতে রূপ নেয়। মিরসরাই এসোসিয়েশন চট্টগ্রামের কর্মকাণ্ডে সেই চিত্রই ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের মেধাবৃত্তি, গুণীজনকে সম্মাননা, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, আত্মকর্মসংস্থান সব মিলিয়ে সংগঠনটি মিরসরাইয়ের মানুষের জন্য চট্টগ্রাম নগরীতে একটি সামাজিক ঠিকানা তৈরি করেছে।
২০২৬ সালের পুনর্মিলনী সেই বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার বার্তা দিয়েছে। রাজনৈতিক ও পেশাগত বিভাজনের বাইরে মিরসরাইয়ের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার যে আহ্বান এবারের অনুষ্ঠানে উঠে এসেছে, সেটিই এখন সংগঠনটির সামনে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—নিজেদের জন্য নয়, মিরসরাইয়ের সামগ্রিক উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে এগিয়ে যাওয়া।
সদস্য ও তাঁদের পরিবারের কয়েক হাজার মানুষের অংশগ্রহণে রাত পর্যন্ত চলা এ আয়োজন শেষ হয় আনন্দ, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির আবহে। তবে একটি দিনের পুনর্মিলনী শেষ হলেও মিরসরাইয়ের মানুষের এই সাংগঠনিক বন্ধনের গল্প যেন সেখানেই শেষ নয়; বরং নতুন উদ্যোগ ও নতুন স্বপ্ন নিয়ে সামনে এগিয়ে চলার আরেকটি অধ্যায়ের সূচনা হলো।
